গাড়ি দাঁড়ায় মিনিট দেড়েক। এই সময়টুকুর ব্যস্ততা এবং কলরবও আজ স্টেশনে ঝিমানো মনে হয়, তারপর গাড়ি ছেড়ে যাবার দু-চার মিনিটের মধ্যে অদ্ভুতভাবে স্টেশন এলাকা যাত্রীশূন্য হয়ে ছমছমিয়ে আসে। গাড়ি থেকে যারা নেমেছে তারা কোনোদিকে না তাকিয়ে তাড়াতাড়ি গেটে টিকিট দিয়ে পথে নেমে যায় - এত লোকে যে টিকিট কাটে এবং সদর গেটে টিকিট দাখিল করে স্টেশন ছাড়ে এও এক অসাধারণ ব্যাপার বটে। চারিদিকে এক নজর তাকালেই টের পাওয়া যায় যে বাড়ির টান আজ সকলের হঠাৎ বেড়ে খায়নি, স্টেশন এলাকা ছেড়ে তফাত হবার তাগিদেই যাত্রীদের এত তাড়া। বিড়ি সিগারেট টানতে টানতে ক'জন বাবুমতো লোক একান্ত বেপরোয়া ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে তাস্থিল্যের সঙ্গে যাত্রীদের লক্ষ করছিল, নামধামও জিজ্ঞাসা করছিল দু-একজনকে। স্টেশন যাত্রীশূন্য হয়ে আসায় এতক্ষণে দিবাকরদের দিকে তাদের নজর পড়ে। মাঝবয়সি বেঁটে লোকটি মুখ বাঁকিয়ে বলে, "চাষাভুসো বাজে লোক, যেতে দাও।" তার খদ্দর-পরা ছোকরা বয়সি সঙ্গীটি পান-রাঙা মুখে আরও দুটো পান পুরে চিবুতে চিবুতে আন্নার দিকে চেয়ে থাকে, আচমকা প্যাঁচ করে পিক ফেলে হাত উচিয়ে আঙুল ঠেরে দিবাকরকে কাছে ডাকে, "এই! শোনো। পথে নেমেও কেউ দাঁড়ায় না।" স্টেশনের লাগাও তেবাস্তার মোড়, দু-তিনটে দোকানে মাত্র আলো জ্বলছে, বাকিগুলিও বন্ধ। চাষের দোকানের আলোটা সবচেয়ে উজ্জ্বল, সাধারণত এ সময় দোকানটা লোকে প্রায় ভরে থাকে, আজ একবকম শূন্য পড়ে আছে। প্রকাণ্ড বাঁধানো বটগাছের তলায় দুজন চাষি কিছু তবিতরকারি সাজিয়ে বসে আছে, কিন্তু ভিন্ডি-বেগুনের দরটা জিজ্ঞাসা করার কৌতূহলও যে আজ কারও নেই। স্টেশনের বাতির মতোই মিটমিট করে দিবাকরের চোখ। সে এদিক-ওদিক তাকায়। চোখের পলকে তার জানাচেনা স্টেশনটি যে ভাবে যাত্রীশূন্য হয়ে যেতে থাকে সেটা যেন ম্যাজিকের মতো ঠেকে তার কাছে। একদল সশস্ত্র সিপাইয়ের দখলে স্টেশনের চেহারা যে অভিনব হয়েছে এটা তার খাপছাড়া লাগে না। এ দৃশ্য দেখা অভ্যাস আছে। কাল এখানে যে ব্যাপার ঘটে গেছে তার বিবরণও সে গাড়িতে শুনেছে। এ রকম দৃশ্যই সে প্রত্যাশা করছিল। ঠিক সময়ে পৌঁছোলেও অবশ্য প্রায় সন্ধ্যা হয়ে যায়, স্টেশনের তেলের বাতিগুলি তার আগেই জ্বালানো হয়। প্ল্যাটফর্মে অল্প কয়েকজন মাত্র যাত্রী গাড়ির জন্য অপেক্ষা করছিল, শঙ্কিত ও স্তব্ধভাবে।
আরও গভীর রাত্রের ট্রেনের জন্যও এ স্টেশনে সাধারণত আরও অনেক বেশি যাত্রী জড়ো হতে দেখা যায়। আজ একদল সিপাই প্ল্যাটফর্মে যাত্রীর অভাব পূর্ণ করেছে। বাচ্চাটাকে বুকে চেপে আন্না চাপা গলায় বলে, দেখব আবার কী? হাঙ্গামা হয়েছে, পাহারা বসেছে, না তো কি থেটার হবে? হাবাব মতো দাঁড়িয়ে থেকোনি, যাই চলো। দিবাকর অবশ্য দেখেও দ্যাখে না, শুনেও শোনে না। পুটুলিটা বগলে চেপে দড়িবাঁধা হাঁড়িটা হাতে ঝুলিয়ে আন্নাকে সঙ্গে নিয়ে গুটিগুটি এগোতে থাকে। গাড়িটা ঘণ্টাধোকে লেট করেছে। দেখলি ব্যাপার? ওরা জন তিনেক তখন সামনে এসে দাঁড়ায়। টিকিট আছে?
ছোটোবকুলপুরের যাত্রীশুনে তারা যেন একটু চমকে। পানখোর ছোকরা আবার প্যাঁচ করে খানিকটা পিক ফেলে। গতকালকের হাঙ্গামায় প্ল্যাটফর্মের লাল কাঁকরে খানিক রক্তপাত ঘটেছিল, ছোঁড়া যেন পানের পিক দিয়ে তার জের টেনে প্ল্যাটফর্মটা রাঙা করে দিতে চায়। দিবাকরও পান ভালোবাসে, রাস্তায় পুরো চার পয়সার তৈরি পান কিনেছে। কাগজের ঠোঙাটা বার করে সেও একটা পান মুখে পুরে দেয়। লোকগুলির এত কাছে দাঁড়ানোর জন্যই বোধ হয় পানটা তার একটু তিতো লাগে। ওদের মাথার পিছনে দূরে কারখানাটার উঁচুতে টাঙানো নিঃসঙ্গ আলোটা তার চোখে পড়ছিল, অন্ধকার আকাশে যেন বিনা অবলম্বনে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে। ওই কারখানার ধর্মঘট নিয়ে কাল স্টেশনের হাঙ্গামা। তিনজন নেতাকে ধরে ট্রেনে চালান দেবার সময় কয়েক শো মজুর তাদের ছিনিয়ে নিতে এসেছিল। তখন গুলি চলে, রক্তপাত ঘটে। গাড়িতে ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ শোনার পর থেকে দিবাকরের আধাচাষি আধামজুর প্রাণটা বড়োই বিগড়ে আছে। তেমাথার পাশে দুটি খোলা গোরুর গাড়ি মুখ থুবড়ে পড়ে আছে, কাছে মাটিতে শুয়ে জাবর কাটছে একজোড়া শীর্ণ ও শান্ত বলদ। স্টেশনের সামনে সাধারণত দু-তিনটি ছ্যাকড়া ঘোড়ার গাড়ি দাঁড়িয়ে থাকে, ঘোড়া যত প্রাচীন, গাড়িগুলি ততোধিক। বেগার খাটার ভয়ে গরিব গাড়োয়ানেরা আজ গাড়িই বার করেনি। গাড়ি চেপে শ্বশুরবাড়ি যাবার মতো বড়োলোক দিবাকর কোনোদিন ছিল না, আজ কিন্তু সে ঘোড়ার গাড়ি চেপেই যেত—আন্নার রূপার গয়না বাঁধা দিয়ে এই উদ্দেশ্যেই সে টাকা জোগাড় করে এনেছে। ছোটোবকুলপুর পৌঁছোতে রাত হবে এটা জেনেই তারা রওনা দিয়েছে, তবে রাত করে মেয়েছেলে আর শিশু নিয়ে তিন মাইল রাস্তা পাড়ি দিতে ঘোড়ার গাড়ির আশাটা ছিল। দিবাকর নির্লিপ্তভাবে বলে, খবর জেনেই এয়েছি বাবু।
আত্মীয়কুটুম আছে সেথা, খপর নিতে এয়েছি তারা বেঁচে আছে না স্বাধীন হয়েছে। বেঁটে লোকটি জিজ্ঞাসা করে, রাত করে ছোটোবকুলপুর যাবে? সেখানকার খবর জানো সব? চারজনেই তারা সম্মুখে পথটার দিকে তাকায়। ছোটোবকুলপুরের এ রাস্তা কিছুদূর গিয়ে বাঁক নিয়েছে, কিন্তু সে পর্যন্ত এখন নজর চলে না—মনে হয় বিপজ্জনক অন্ধকারেই বুঝি পথটা হারিয়েদুই গাড়ির দুজন মালিকেরই আবির্ভাব ঘটে। আবছা আলোয় মনে হয় একজন যেন পুরানো বটগাছটা এবং অন্যজন দোকান ঘরের বেড়া ভেদ করে কাছে এসে দাঁড়াল। শুনে তারা দুজনেই ঘাড় নাড়ে। ওরে বাবা, রাতের বেলা ছোটোবকুলপুর কে যাবে। সেখানে সৈন্যপুলিশ গ্রাম ঘিরে আছে, রীতিমতো লড়াই চলছে'তাদের তাড়া নেই, গোরুর গাড়িতে কম্পিটিশনও নেই। ধীরেসুস্থে তারা জানতে চায় দিবাকরেরা কোথায় যাবে। বেঁটে বলে, ও বাবা তোমার দেখি চটাং চটাং কথানা বাবু, গরিব মানুষ কথা কোথা পাব? এখন ভরসা গোবুর গাড়ি। আজ্ঞে ছোটোবকুলপুর যাব। গাড়োয়ান কই হে! দিবাকর ডাকে। শার্টের বুক পকেট থেকে দিবাকর দুখানা টিকিট বার করে দেখায়। আছে। ছোটোবকুলপুর। কোথা যাবে? ২৭৬ মানিক রচনাসমগ্রএ অঞ্চলে ঘন বসতি, গায়ে গায়ে লাগানো বড়ো বড়ো গ্রাম তবু এখন সন্ধ্যারাত্রেই রাস্তায় প্রায় লোক চলাচল নেই। গেঁয়ো লোকের পথ চলাও খাপছাড়া রহস্যময় হয়ে উঠেছে। এই পথ ধরেই গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে লোকে পাড়ি দেয়, আজ যেন চারিদিকে সকলেরই দীর্ঘ পথ হাঁটার প্রয়োজন ফুরিয়ে গেছে। রাস্তার পাশ থেকে আচমকা হয়তো একজন রাস্তায় উঠে আসে, জোরে জোরে পা ফেলে খানিকটা এগোতে না এগোতেই আবার রাস্তার ধারের অন্ধকারেই মিশিয়ে যায়। মাত্র দুটি একটি লোকের এ রকম টুকটাক খুচখাচ খুচরো চলাফেরার প্রয়োজন নির্জনতা ও স্তব্ধতাকে আরও বেশি অস্বাভাবিক করে তোলে। গাড়ি গাছপালা বাড়িঘরের আড়ালে যাওয়া পর্যন্ত টর্চের আলো আন্নার গায়ে সাঁটা থাকে, ট্রেনের প্যাসেঞ্জার নিরীহ নির্দোষ মেয়েছেলেই যে যাচ্ছে গাড়িটাতে সেটা যেন যতক্ষণ সম্ভব প্রত্যক্ষ করা চাই। গেছে। বাঁ হাতে কোলের বাচ্চাকে সামলে ডান হাতে আন্না দিবাকরকে এক পা পিছুতে ঠেলে দেয়, নিজে এগিয়ে দায়িত্ব নেয়। ওখান তক্ নাই বা গেলে বাবা? যদ্দুর যেতে চয় ওও নিয়ে চলো, বাকি রাস্তা মোরা হেঁটে যাব। ভাড়া ঠিকমতো পাবে। ওমা, তোমরা পুরুষ হয়ে ডরাচ্ছ! আন্না মিষ্টি সুরে বলে, বাচ্চা কোলে মেয়েছেলে যাব, তোমরা পুরুষ হয়ে ডরাচ্ছ! . রাম চুপ করে থাকে।
তার বয়স বেশি, সাহস কম। গগন ঘোষ বলে, কমলতলা তক যেতে পারি। তাই হোক। কমলতলার সীমা পেরিয়েও যদি নামিয়ে দেয় তবু প্রায় আধমাইল হাঁটতে হবে। পুরো দেড়ক্রোশ হাঁটার চেয়ে সে অনেক ভালো। একটা গাড়িতে বলদ জুড়লে আন্না উঠে বসে, এ কসরত তার অভ্যাস আছে। গগনের গাড়িটা নড়বড়ে, ক্রমাগত লেজ মলে তাড়া না দিলে শীর্ণ বুড়ো বলদ এক পা এগোতে চায় না। আন্না আগ্রহের সঙ্গে ছোটোবকুলপুরের খবর জিজ্ঞাসা করে, তবে গাঁয়ে ঘরে পৌঁছোবার আগে বাপ-ভাইয়ের কুশল জানার আশা সে করে না। গ্রামের সাধারণ অবস্থার ঘনিষ্ঠতর বিবরণ, অনেক নতুন খবর গগনের কাছে জানা যায়। দূর থেকে তারা শুনেছিল যে ছোটোবকুলপুরের অবস্থা অতি শোচনীয়, প্রচণ্ড আঘাতে গাঁয়ের গেবস্থ জীবন তছনছ চুরমার হয়ে গেছে। গগনের কাছে শোনা যায়, ব্যাপার 'ক তা নয়। গোড়ায় গাঁয়ের মধ্যে খুব খানিকটা অত্যাচার হয়েছিল, কিন্তু তারপর গাঁয়ের লোক এম. বাঁটসাঁট বেঁধে তৈরি হয়ে জেঁকে বসেছে যে চৌধুরী বা ঘোষেদের কোনো লোক অন্তত দু ডজন? 'ল ছাড়া গাঁয়ের ভেতরে ঢুকতেই সাহস পায় না। গগন জবাব দেয়: ইষ্টেশনের ট্রেইনের মেয়েদের। কমলতলি যাবে। রাম বলে, রাতের বেলা কে অত হাঙ্গামা করে, না কী বলো ঘোষের পো? একবার মুখ খুললে গগনকে থামানো যায়। গোরুর লেজ মলে মলে মুখে গোরু তাড়ানোর অদ্ভুত আওয়াজের ফাঁকে ফাঁকে সে চারিদিকের অবস্থা বর্ণনা করে যায়, তার মতে কলিযুগ সত্যই এবার শেষ হতে চলেছে। সমস্ত লক্ষণ থেকে তাই মনে হয়। নইলে রাজায় প্রজায় এমন যুদ্ধ বাধে? অন্ধকার নিস্তব্ধ পথে বেশ শোরগোল তুলেই গাড়ি চলে। রাস্তার ধারের কোনো কোনো ঘরের বেদখল দাওয়া থেকে মাঝে মাঝে টর্চের আলো এসে পড়ে গাড়িতে, গুরুগম্ভীর কণ্ঠে প্রশ্ন আসে: কে 'যায়? কোথা যাবে? মোরা কলির পাপী লোক, এ লড়ায়ে মোরা মরব। মোদের ছেলেপুলেরা ফের সত্যযুগ করবেছোটোবকুলপুরের যাত্রী
তেনা সগগে গেছেন—তিপ্পানের মন্বন্তরে। রোগ ব্যারাম কিছু নয়, উপোস দিয়ে মিত্যু। হাওড়ায় থাকি, ঘনশ্যাম-বেটেনট কারখানায় মজুর খাটি। ইদিকে হাঙ্গামা শুনলাম, বউ কাঁদতে লাগল যে তার বাপ ভাই মরেছে না বেঁচে রয়েছে। তা ভাবলাম কী যে কারখানার ধর্মঘট দু-দশদিনে মেটার নয়, যা দিনকাল। বউকে নিয়ে দেখে আসি শ্বশুরবাড়ি ব্যাপার কী। যাব নাকি এগিয়ে ছোটোবকুলপুর তক? —গগন অনুমতি চাওয়ার সুরে বলে, দিবাকরেরাই যেন তাকে যেতে বারণ করেছে? —চলো যাই মেয়া, তোমায় নিয়ে যাই। মাঝ রাস্তায় কেমন করে নামিয়ে দি বলো, আঁ? সে তো চিনবে, না চিনলেও চিনবে। যাদের সঙ্গে যোগসাজশ তাদের যদি না চিনবে তো কাদের চিনবে? তুমি যে সত্যি দিবাকর দাস, মজুর খাটো, শ্বশুরবাড়ি আসছ, কোনো বদ মতলব নেই, তার প্রমাণ দিতে পার? আন্না খুশি হয়ে অন্তরের কৃতজ্ঞতা জানিয়ে বলে, ভগবান মুখপোড়া একচোখো কানা, নইলে তোমার নতুন গাড়ি হত বাবা, জোয়ান বলদ হত। সবিনয়ে স্পষ্ট সরল ভাষায় দিবাকর তাদের আগমনের কারণ ও বিবরণ দাখিল করে। কাঁদাকাটা করে না, ভয়ে দিশেহারা হয়ে পায়ের তলায় আছড়ে আছড়ে পড়ে না বলে বোধ হয় তার ব্যাখ্যা এদের পছন্দ হয় না। দীর্ঘ থলথলে লোকটি আঙুল উঁচিয়ে বলে, এই! কানে কানে কী কথা হচ্ছে? চুপিচুপি শলাপরামর্শ চলবে না, খর্দার। আন্না বলে, গাঁয়ের চাষাপাড়ার দশটা লোক ডেকে পাঠাও না বাবুরা, মোকে দু-চারজন চিনবেই, গাঁয়ের মেয়া আমি। দেখতে দেখতে সাত-আটজন গাড়িটা ঘিরে ফেলে। টুপিটা ঠিক করে বসাতে বসাতে মাঝ বয়সি মোটা লোকটি, সেই বোধ হয় বেসরকারি দলপতি, গম্ভীর গলায় বলে, কোথা থেকে আসছ? ষোলো সাতেরো বছরের স্বেচ্ছাসেবক ফরসা ছেলেটি খিলখিলিয়ে হেসে ওঠে, দীর্ঘ থলথলে চেহারার প্রৌঢ়বয়সি লোকটির ধমকে বিষম খেয়ে থেমে যায়, কাশতে কাশতে বেদম হয়ে পড়ে। কলতলায় মস্ত ছাউনি পড়েছে। চোখ তুলে সেদিকে দেখে গগন মাথা চুলকায়। পুঁটলিওতে কী আছে? বোমা বন্দুক? আন্না দিবাকরের কানে কানে বলে, গাঁয়ের লোক ডাকতে ডরাচ্ছে, জানো? কী প্রমাণ দেব বলেন? সাক্ষী প্রমাণ তো সাথে আনিনি। আজ্ঞে কাঁথা কাপড়। বাপের নাম? কোথায় থাক? কী কর? এদিকে এসেছ কেন? গগন বলে, ইষ্টিশনের টেরেনগাড়ির প্যাসিঞ্জার আজ্ঞা। মোর নাম দিবাকর দাস। শাট্ আপ! তোকে কে জিজ্ঞেস করেছে? তোমার নাম?
আন্নার বাচ্চাটা রাস্তায় দু-একবার পায়খানা করেছে, নোংরা ন্যাকড়া দলা পাকিয়ে আন্না পুঁটলির মধ্যে রেখেছিল। ঘাঁটতে যাওয়ায় অনুসন্ধানীর হাতে ময়লা লেগে যায়। গন্ধে ও স্পর্শে রাগ চড়ে যাওয়ায় বেহিসাবির মতো পুঁটলিটাতে সে বল শুট করার মতো লাথি মেরে বসে। ফলে কাদার মতো তরল পদার্থ খানিকটা তার পায়েও লাগে, ছিটকে বন্দুকের গায়েও একটু আধটু লেগে যায়। তিনটি পান অবশিষ্ট ছিল, তিনজনের মুখে যায়। পান চিবোতে চিবোতে একজন লণ্ঠনের আলোয় পান মোড়া ছাপানো কাগজটার দিকে এক নজর তাকিযেই যেন বৈদ্যুতিক শক্ খেয়ে চমকে ওঠে। কাগজটা ভালো করে মেলে ধরে সে বিস্ফারিত চোখে বড়ো হরফের হেডলাইনটার দিকে চেয়ে থাকে—‘ছোটোবকুলপুরের সংগ্রামী বীরদের প্রতি’। ধমকানির চোটে দিবাকরেরা চুপ হয়ে যায়, বাচ্চাটা ককিয়ে কেঁদে উঠে প্রতিবাদ জানায়। ওদের দিকে পিছন ফিরে বসে ছেলেকে শান্ত করতে করতে আন্না তাদের মন্তব্য ও পরামর্শ শোনে। আচমকা গোরুর গাড়ি চেপে হাজির হয়ে তারা যে গুরুতর ও জটিল পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছে তা নিয়ে মানুষগুলি রীতিমতো বিব্রত ও বেশ খানিকটা বিভ্রান্ত হয়ে পড়েছে। সঙ্গের জিনিস বেশভূষা চেহারা দেখে আর কথাবার্তা শুনে সত্যি সত্যি টের পাবার জো নেই যে এরা সত্যিকারের নিরীহ সাধারণ গোবেচারি চাষামজুর মাগভাতার ছাড়া অন্য কিছু নয়, কিন্তু সেটাই হয়ে দাঁড়িয়েছে দারুণ সন্দেহের কারণ। যে টাণ্ডব চলেছে ছোটোবকুলপুরে কদিন ধরে, তাতে সত্যিকার কোনো ভীরু মুখ্য ছোটোলোক মাগছেলে সাথে নিয়ে সাধ করে কখনও তার মধ্যে আসতে চায়? তাও আবার হাঙ্গামার খবর জানবার পরে! বাজে লোকের এ সাহস হবে কোথেকে? তার চেয়েও বড়ো কথা, সন্দেহের কথা, চারিদিকে এত রাইফেল বন্দুকের সমারোহ দেখেও ওরা মোটে ভড়কে হয়নি, দিব্যি নির্ভয় নিশ্চিন্ত ভাব। তার মুখের কথা খসতে না খসতে দুজনে দিবাকরকে ধরে টেনে নামিয়ে দেয়। উৎসাহ অথবা উত্তেজনার আতিশয়্যে একজনের হাত থেকে পড়ে গিয়ে মুখবাঁধা মাটির হাঁড়িটা ভেঙে যায়, ছড়িয়ে পড়ে আধ হাঁড়ি জল আর তাতে কিলবিল করে গোটা ছয়েক শিং মাছদিবাকর গোসা করে বলে, দিলে তো বাবুরা, গরিবের পথির দফা মেরে দিলে তো? রাগি বউটা এখন খাবে কীগাড়িতে বিছানো বিচালি তুলে, ছেঁড়া বস্তাটার ভাঁজ খুলে খোঁজার পর গগন আর দিবাকরের গা খোঁজা হয়। দিবাকরের শার্টের পকেট থেকে বার হয় পানের মোড়কটা। একজন নিচু গলায় বলে, নিশ্চয় কোনো ডেঞ্জারাস লোক ছদ্মবেশে এসেছে।
আরেকজন বলে, সার্চ করা যাক না? বলি ওহে দিবাকর দাস, একজন গম্ভীর মুখে বলে, কারখানায় খেটে খাও বললে না? কুলি মজুরের বউরা কবে থেকে শিং মাছের ঝোল খাচ্ছে হে? পাঁচ-ছটাকা শিং মাছের সের। কদমছাঁটা চুল লম্বাটে মাথা পাঞ্জাবি গায়ে বয়াটে চেহারার ছোঁড়াটা বলে, বারণ কেন, বারুণ নেই। তোমরা কে, কী মতলবে এসেছ জানা গেলেই যেতে দেওয়া হবে। দীর্ঘ থলথলে লোকটি হুকুম দেয়, এই! জিনিসপত্র নিয়ে নামো। ও সব যাতে জানা যায় তার একটা বিহিত করো বাবুরা? শিঙিমাছ খাওয়া মোদের বারণ আছে নাকি বাবু? এ ষোড়নের অপমানে কুদ্ধ হয়ে সে গর্জন করে ওঠে, শাট্ আপ, বেয়াদপচোপ, তামাশা হচ্ছে, না? বাঃ, সাজা পান। দে তো একটা। গাঁয়ে যাওয়া কি বারণ বাবু? একশো চুয়াল্লিশ রটিয়েছে? দিবাকর প্রশ্ন করে। ছোটোবকুলপুরের যাত্রী ২৭৯ইস্তাহার? তাই বটে। বিপজ্জনক ইস্তাহার! যদিও দুমরে মুচড়ে চুন আর পানের রসে মাখামাখি হয়ে গেছে, তবু চেষ্টা করে আগাগোড়া পড়া যায়। পড়তে পড়তে চোখও কপালে উঠে যায়। তবু তারা স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে। আর শূন্যে হাতড়াতে হবে না, মনগড়া সন্দেহ সংশয়ে জর্জরিত হতে হবে না, একেবারে অকাট্য প্রমাণ পাওয়া গেছে হাতেব মুঠোয়। এবার ষড়যন্ত্র ফাঁস হয়ে যাবে। নিগূঢ় আবিষ্কারের উত্তেজনায় কাঁপা গলায় চেঁচিয়ে ওঠে, পাওয়া গেছে! ইস্তাহার পাওয়া গেছেআর ঢং কোরো না। এবার আসল নাম বলো দিকি। দিবাকর আর আন্না পরস্পরের মুখের দিকে তাকায়। কেন? তা কেন করতে যাব? পানওয়ালা জড়িয়ে দিল না তুমি ভেবে-চিন্তে পান কিনে ইস্তাহারটাতে জড়িয়ে নিলে? এ ইস্তাহার পেলে কোথা? ২৮০মানিক রচনাসমগ্র
ধমকধামক গালমন্দ নীরবেই শুনে যাচ্ছে, চিরকাল তার বাপদাদা যেমন শুনে এসেছে, কিন্তু থেকে থেকে আচমকা কী যেন ঝিলিক মেরে যাচ্ছে, ঝলসে উঠছে তার চোখে। দেখলে ভয় করে। গল্পটা বলার আগে তবে একটা সংশয় মিটিয়ে দাও। মানুষটা চাষা, তাতে গরিব, তার মেজাজ হয় কীসে? জমি নেই, ভাতকাপড় নেই, আরামবিরাম স্বাস্থ্য নেই, দেশের মালিক সরকারের কাছে দূরে থাক গাঁয়ের মালিক জমিদারের বাজার সরকারের কাছে পর্যন্ত মানুষ বলে গণ্য হবার যোগ্যতা নেই, মেজাজের মতো এমন ফ্যাশেবল দামি চিজ সে কোথা পেল? কিছু অর্থ সংস্কৃতি আরাম বিলাস প্রভাব-প্রতিপত্তি অর্থাৎ এককথায় লোকের ওপর ঝাল ঝাড়বার অধিকার না থাকলে তো মেজাজ গজায় না—ওটা খেয়ালখুশির অঙ্গ। চা আর ডিম ভাজা এসেছিল দুজনের জন্য, মনোরঞ্জন নিঃশব্দে দুটি প্লেটের ডিম ভাজাই নিজের মুখে পুরে দিতে থাকে। এককালে সে দারুণ কংগ্রেসি ছিল, আজকাল একেবারে চাষাভুসো বনে গেছে। অনেকদিন পরে তাকে দেখে বড়ো আনন্দ হচ্ছিল। ভাষাহীন খিদে দিয়ে এত সহজে সে-ই শুধু চোখের পলকে আত্মীয়তা ঝালিয়ে নিতে পারে। চাষাভুসো বনার কারণও বোধ হয় তাই। কথাটা বুঝে মনোরঞ্জন মৃদু হাসে। —বেশ, মেজাজ না বলে রাগ বলো, মাথা গরম বলো। যাব কিছু নেই তাব ঘৃণা রাগ এ সব তো কেউ কাড়তে পারবে না? গল্প বলতে মনোরঞ্জন পটু নয়। আমাকেই গল্পটা মনের মধ্যে সাজিয়ে গুছিয়ে নিতে হয়: অভিজ্ঞতার স্বাদটা অবশ্য এসে যায় মনোরঞ্জনেরই। রাখালবাবুর মতো মস্ত লোক, খুশি হলে সে তার গলা কাটতে পারে, সেও একভাবে ভেতরে ভেতরে ভৈরবকে ডরায় ভয় তাকে কমবেশি সকলেই করে। তার মেজাজের খবর কারও অজানা নয়, বহুদিন থেকে নানাভাবে পরিচয় পেয়ে আসছে। ঝাঁ করে মাথায় তার রক্ত চড়ে যায় এবং সে অবস্থায় স্বয়ং থানারডিম শেষ করে সে বলে, তোমার তাকানি দেখে ভৈরবকে মনে পড়ছে। সেও এমনিভাবে একদৃষ্টে তাকিয়ে মানুষকে বিব্রত করে। দেড়-দুবিধে জমি হয়তো আছে। তা ছাড়া ভাগে চাষ করে। মেজাজ তোমাকে মোটেই বিব্রত বোধ হচ্ছে না। কিন্তু ভৈরব কে? লক্ষ্মীপুরের একজন চাষি। তার মেজাজের অদ্ভুত গল্প শুনলে—গরিব চাষি? দারোগাবাবুকে পর্যন্ত সে যে মেরে বসতে পারে সে প্রমাণও ভৈরব দিয়েছে। গ্রাম্য আক্রোশে একজন তাকে মিথ্যে চুরির দায়ে জড়িয়েছিল, দারোগাবাবু তদন্তে এসেছে।
ধমকধামক এবং দু-চারটে চড়চাপড় সে যথারীতি দিব্যি হজম করে যাচ্ছিল, দারোগাবাবু হঠাৎ একটা খারাপ রসিকতা করে বসায় সেটুকু তার সইল না, ধাঁ করে গালে একটা প্রচণ্ড থাবড়া বসিয়ে দিল! চড়চাপড় যার সইছিল গালমন্দও সইছিল একটা বদ রসিকতায় যে তার মাথা বিগডে যাবে, কে এটা ধারণা করতে পারে? চুরির দায় বাতিল হয়ে গেল কিন্তু জেল তাকে খাটতে হল ওই অপরাধে। বেগুন খেতে গোবু ঢোকার জন্য কানাইয়ের সাথে একদিন তার বচসা, সে ঝগড়া অন্যের মধ্যে খুব বেশি হলে হাতাহাতি পর্যন্ত গড়াত—আচমকা লাঠির ঘায়ে সে কানাইয়ের মাথা ফাঁক করে দিল। তাতেও কি রাগ পড়ল? সেই লাঠি দিয়ে অপরাধী গোবুটার মাথাতেও আরেক ঘা না বসিয়ে পারল না, গোবুটা গেল মরে। এই নিয়ে হল আরেক দফা জেল। এবং একটা সামাজিক হাঙ্গামা। এ সব লোককে নিয়ে ওইখানে বিপদ। রাগ হলে কাণ্ডজ্ঞান হারিয়ে বসে, নিজের ভালোমন্দের বিচার বিবেচনা পর্যন্ত লোপ পায়, মরবে কী বাঁচবে খেয়াল থাকে না। সুতরাং তুচ্ছতায় যতই সে মশামাছির শামিল হোক, সহজে তাকে কেউ ঘাঁটাতে চায় না। তাই থেকে একটা মোটা সিদ্ধান্ত বোধ হয় করা চলে। যতই মনে হোক যে মেজাজটা তার একেবারেই অন্ধ ও বেহিসেবি, জগৎসংসার ভুলে গিয়ে ঝোঁকের মাথায় যা খুশি কাণ্ড করে বসে, ঠিক অতটা হয়তো সত্য নয়। মানুষ যে তাকে ভয় করে, সহজে তার পেছনে লাগতে চায় না, এটা বোধ হয় সে বোঝে। কুটুমবন্ধু পাড়াপড়শি তাকে বাঁচিয়ে চলার চেষ্টা করে, তবু সামান্য কারণে আচমকা ধারণাতীতভাবে তবু মাঝে মাঝে বেধে যায়। হেটোরা দোকানিদের সঙ্গে তো তার নিত্য হাতাহাতির উপক্রম ঘটে। মার খেয়ে খেয়ে বাড়ির লোকের প্রাণ যায়। গালমন্দ সে বিশেষ দেয় না, খানিক গালাগালি দিয়ে সামলে যাবার মতো নবম রাগ তার কদাচিৎ হয়। তার গরম হওয়া মানেই একেবারে চরম অবস্থায় পৌঁছে যাওয়া। তাব বউ কালীর হয়েছে জ্বর, হয়তো আগের দিন তাব পিটুনি খেয়েই। শম্ভুর দোকানে সে বউয়ের জন্য চার পয়সার সাগু কিনতে গেছে। দোকানে তখন ভিড়ের সময়, দু-চারজন ভদ্রলোকও আছে। শম্ভু মুখ বাঁকিয়ে শোলোক বলে, চার পয়সার সাগু খায়, বউ ডিঙিয়ে শাউড়ি পায়বলল, বামুন আছো, বামুন থাকো, গাল পেড়োনি। করবনি যাও প্রাচিত্তির। কর গে যাও একঘরে। খাটব নরক দশ জন্ম। গো-হাত্যার জন্য বিধানমতো প্রায়শ্চিত্ত সে করত, ভট্টাচায্যের কয়েকটা চটাং চটাং কথায় মেজাজ গেল বিগড়ে। গুড়ের হাঁড়িতে হাত ঢুকিয়ে খাবলা খাবলা গুড় সে শম্ভুর মুখে ছুঁড়ে মারে।
পরে যা হবার তাই হয়, গরিব অসহায় চাষি তো। কিন্তু সে হিসাব তো আর মেজাজ বোঝে নাকেন হে কত্তা? চার পয়সা পয়সা নয়? ওজন করো তুমি, বেশি হয় ফিরে নাও বেশিটা তোমার। তোমার ঠেয়ে ভিক্ষে চাইছি? শুধু সাগু ছুঁড়ে ঠান্ডা হবে তেমন মেজাজ নয় ভৈরবের। এদিক ওদিক তাকাতে সামনে গুড়ের হাঁড়িটা নজরে পড়ে। ভৈরব সাগু ছুঁড়ে মারে শম্ভুর শোলোক-বলা মুখে। তোর সাগু তুই খা। খুলেই মেজাজে আগুন ধরে যায় ভৈরবের। কম দিয়েছ শম্ভু। ওজন করে দাও। যাও যাও, বেশি দিয়েছি। চার পয়সার সাগু, তার ওজন চায়গুড় দিয়ে খা।
২৮২
মানিক রচনাসমগ্র।
তারপর একদিন এল লক্ষ্মীপুরের ওই হাঙ্গামা। গাঁয়ের লোকেরা দল বেঁধে রাখালের চোরাই ধানচাল চালান বন্ধ করতে যাওয়া নিয়ে যার সূত্রপাত, পরে অবশ্য ব্যাপার অনেকদূর গড়ায়। কারণ, গরিবের যে কোনো বেয়াদবিই ভীতিকর, সমূলে উৎপাটন না করলে চলে না। ধানচাল উপে যেতে যেতে সে এলাকায় মানুষের প্রাণ যায় যায় হলে মরিয়া হয়ে তারা নিজেরাই প্রতিকার করবে স্থির করে, ভৈরবও সেখানে পরামর্শের গোড়ার দিকে উপস্থিত ছিল। ব্যবসায়ী-জমিদার রাখালের অপকর্মের বিবরণ শুনতে শুনতে সে গরম হয়ে উঠেছিল, জোর গলায় দাবি জানিয়েছিল যে, উইঁ, শুধু ধানচাল নয়, আগে ও লোকটাকে সবাই মিলে ফাঁসি দিতে হবে, তারপর ধানচাল ঠেকানো। বুড়ো বনমালী তাকে ধমক দিয়েছিল, তুই থাম ভৈরব। এ ছেলেখেলা নয়। গ্রামের লোককে দাবাতে যে তাণ্ডব শুরু হয় তারপর তারা কেউ তা কল্পনাও করতে পারেনি। রাখালের গুন্ডাব দল জড়ো হয়ে পাড়ায় পাড়ায় হানা দেয়, প্রথমটা হকচকিয়ে গেলেও গ্রামের লোক শেষে প্রাণের দায়ে মরিয়া হয়ে দল বেঁধে তাদের মেরে হটিয়ে দেয়। পুলিশের স্থায়ী ছাউনি পড়ে লক্ষ্মীপুরে। করে কটা পাড়ায় গ্রামবাসীরা আত্মরক্ষার এমন শক্ত ব্যবস্থা করে যে রাখালের গুন্ডাবা দল বেঁধেও সেখানে ঢুকতে সাহস পায় না।
মানে? অত্যাচার মানেই বিকাব। অত্যাচারীর মনে দাবুণ আতঙ্ক থাকে। নিজের বিশ্বাস, নিজের সংস্কার, নিজেব নিয়মকানুন পর্যন্ত সে ভাঙছে—নিজের বিরুদ্ধে যাচ্ছে। সকলকে পায়ের নীচে পিষে রাখবার জন্য ওরা নিজেরাই নীতি ধর্ম আইন কানুন আদর্শ খাড়া করে—নিজেবাই আবার তা ভাঙে। আত্মবিরোধ এড়িয়ে যাবার সাধ্য ওদের নেই, অন্যায় করতে ওরা বাধ্য। নেশাখোর যেমন নেশা চড়ায়, এরাও তেমনি অন্যায়কে আরও উগ্র আরও বীভৎস করে চলে। হিটলার অসংখ্য ভয়াবহ অন্যায় করেছে, যাতে তার এতটুকু স্বার্থসিদ্ধি হয়নি।
গুন্ডারা ওই একই জাত। কাহিনির এইখানে থেমে গিয়ে মনোবঞ্জন আচমকা প্রশ্ন করে: কেন বলো তো? পাশবিক অত্যাচারের মানে হয়, কিন্তু স্বামীর সামনে কেন? মাতাল মার্কিন সোলজারদেরও এই ঝোঁক দেখা যেত। কোনো কারণ ভেবে পাই না। বলে গটগট করে সে উঠে এসেছিল বৈঠক থেকে। তাতে বিশেষ কেউ অখুশি হয়নি। তাকে সঙ্গে রাখার ঝক্কি কম নয়। একা তার জন্যই হয়তো সম্পূর্ণ অকারণে দু-একটা খুনজখম হয়ে যাবে, সে মাথা ঠান্ডা রাখতে পারবে না। তারা চলে যাবার পর কালী কিছুক্ষণ নিস্পন্দ হয়ে পড়ে থাকে। কাছাকাছি কোনো চালায় আগুন ধরেছে, বাইরে জ্যোৎস্নাময়ী রাত্রির রক্তিম দ্যুতিময় রূপ দেখা যায়। ভৈরব মৃদুকণ্ঠে বলে, বাঁধনটা খুলে দে বউ। ভৈববের ঘরটা ছিল এই এলাকার কিছু তফাতে। একদিন একদল লোক ঘরে ঢুকে খুঁটিব সঙ্গে তাকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে জড়িয়ে বাঁধে। বাচ্চা ছেলেটা কালীর কোলে গলা ফাটিয়ে চেঁচাচ্ছিল, ভিনিয়ে নিয়ে ভৈববের পিঠের সঙ্গে ছেলেটাকেও তারা দড়ি দিয়ে পেঁচিয়ে পেঁচিয়ে বাঁধে। তারপর সেইখানে ভৈববের চোখের সামনে কালীর উপব একে একে তারা সাতজন অত্যাচার করে। আলো জ্বালেনি। জ্যোৎস্না ছিল। গরিবের ছোটো ঘব, খুঁটিটাব তিন-চাবহাত তফাতেই ছেঁড়াকাঁথার বিছান'। মনোরঞ্জন একটু ভেবে বলে, তাই কী? কে জানেতবে যা খুশি করো। মোকে ডেকেনিছোটোবকুলপুরের যাত্রী ২৮৩ভয়ে ভয়ে কালী তার বাঁধন খুলতে আরম্ভ করে। ভয়টা তার অকারণ নয়, এতদিন একসঙ্গে ঘর করেছে, মানুষটাকে সে সবার চেয়ে ভালোভাবেই জানে। কারণে অকারণে কত ছ্যাঁচা খেয়েছে, গায়ে আজও তার অনেক চিহ্ন আঁকা আছে এখানে ওখানে। এ অবস্থায় আজ ভৈরবের মাথা ঠিক আছে এটা সে স্বপ্নেও সম্ভব বলে ভাবতে পারছিল না। তুচ্ছ কারণে মানুষটা খেপে যায়, মহামারি কাণ্ড বাধিয়ে দেয়, বাইরে রাগের কারণ ঘটলে ঘরে হাতের কাছে তাকে পেয়ে পিটিয়ে দেয়, আজ রাতের এত ভয়ানক কাণ্ড তার সইবে কী করে? বাঁধন খুলে দিলে দিশেহারা উন্মাদ ভৈরব যদি প্রথমে তাকেই খুন করে বসেদড়ি খুলে দিলে যে খুঁটিতে ওকে তারা বেঁধেছিল তাতেই ঠেস দিয়ে ভৈরব মেঝেতে বসে পড়ে। মনে হয়, তার সামনে তার বউয়ের ওপর যে পাশবিক অত্যাচার হয়ে গেল, তারই গায়ে গায়ে লেগে থেকে কচি ছেলেটা যে ওদের দড়ির ফাঁসে দম আটকে মরে গেল, এ সব কিছুই সে গায়ে মাখেনি। তার রাগও নেই, হা-হুতাশও নেই। কালী তাড়াতাড়ি প্রদীপ জ্বালে। ছেলের দিকে এক নজর তাকিয়েই এতক্ষণ পরে সে প্রথম আর্তনাদ করে ওঠে।
এ পর্যন্ত মাঝে মাঝে শুধু তার গোঙানি শোনা গিয়েছিল। বিক্রি করে কিছু বাড়তি রোজগারের জন্য ঘরে ভৈরব পাটের দড়ি পাকায়, বাঁধবার দড়ির তাদের অভাব হয়নি। দিশেহারা উন্মাদ তারা, ওইটুকু ছেলেকে পাটের সরু পাকানো দড়ি দিয়ে বাপের সঙ্গে জড়িয়ে জড়িয়ে বেঁধেছে গায়ের জোরে, গলাতেও প্যাঁচ পড়েছে। ইচ্ছা করে কিনা তারাই জানে। ছেলেটা খুব চেঁচাচ্ছিল, কান্না থামাতে হয়তো এইভাবে গলায় দড়ি জড়িয়েছে। দড়ি খুলে নামাতে নামাতেই টের পাওয়া যায় ভৈরবের আশঙ্কাই সত্য, ছেলেটা শেষ হয়ে গেছে। ভৈরবের নম্র শান্ত সুর বনমালীকেও আশ্চর্য করে দেয়। কোনোদিন কোনো অবস্থাতে কেউ কখনও তাকে এমন ধীরভাবে কথা বলতে শোনেনি। প্রদীপের আলোয় তার দিকে চেয়ে বনমালী ভাবেনে: পাগল 'হয়ে যায়নি তো মানুষটা? তার শান্ত গলার আওয়াজে কালী বোধ হয় আশ্চর্য হয়ে যায়। তবু সে ভয়ে ভয়ে বলে, মোকে কিছু করবে না তো? বনমালী ঘরে এসে বলে, আরও ক-জনা আসছে। বন্দুক হাতে পাহারা ছিল, মোরা এগোতে পারিনি ভাই। তোমার ঘরে অত্যাচার করবে তাও মোদের ভাবনার অগোচর ছিল। সেদিন চটাচটির পর তুমি তো তফাতে ছিলে বরাবরকালী হাউমাউ করে কেঁদে উঠতে খুঁটিতে বাঁধা ভৈরব সেই রকম শান্ত গলায় বলে, মোর বাঁধনটা খোল আগে। উষ্ণ নিশ্বাস ফেলে বনমালী বলে, এর প্রতিশোধ পাবে একদিন। না, তোর কী দোষ? শিগগির দড়ি খোল—ছেলেটা বুঝি শেষ হয়ে গেল। আবার কে আসে? ভৈরব অস্ফুট স্বরে বলে। শূখো—সাড়া দাও! কাছে সরে এসে কালী বলে। আমি। বনমালী। গরিবের এই দশা। কালী নিজে টের পায় না, সেও কত শান্ত ধীর হয়ে গেছে, ছেলের জন্য উন্মাদিনীর মতো সেও আছড়ে পিছড়ে কাঁদছে না। সাধারণভাবে অসুখে বিসুখে ছেলেটা মরলে এতক্ষণ তার গলা ফাটানো আর্তনাদ সারা গাঁকে জানান দিত তার শোকের খবর। সাতজন অত্যাচার করেছে। স্বামীর সামনে। কে? রক্তাক্ত দেহে রক্তাক্ত মন কি সাধারণ শোক দুঃখের স্তরে থাকতে পারে? ভৈরবের সঙ্গে কালী ভৈরবের পাড়ার ভিতরের দিকে ব্রজেন দাসের বাড়ির একটা ঘরে আশ্রয় নেয়। একদিকে তাকে দেখে যেমন টের পাওয়া যায় না সে সেই বদরাগি পাগলাটে ভৈরব, অন্যদিকে তেমনই ভাবাও যায় না সেদিন রাত্রে তার জীবনে কী ভীষণ ঘটনা ঘটে গেছে। গ্রামরক্ষী দলে সে নাম দেয়, কাজ করে, মন দিয়ে আলাপ আলোচনা পরামর্শ শোনে। সারাদিন ঘুরে বেড়ায় আর মানুষকে সবলভাবে সংক্ষেপে নিজের কাহিনী বলে।
দাওয়ায় বসে, রাস্তায় দাঁড়িয়ে, হাটে বাজারে চাষাভুসো লোককে পরমাত্মীয়ের মতো ঘটনাটা শুনিয়ে জিজ্ঞাসা করে, প্রতিকার করবে না? তুমি মোর ভাই? একে একে আরও কয়েকজন চেনা লোক আসে, ভৈরবের ধীর শান্ত ভাব তাদেরও অবাক করে দেয়। নগেনের বউ আর নিতাইয়ের পিসি এসেছিল, এক কোণে তাদের কাছে বসে কালী বিনিয়ে বিনিয়ে কাঁদে। খানিকক্ষণ চুপচাপ শুনে ভৈরব বলে, কাঁদিস না বউ। আর কান্না কীসের? যদ্দিন বেঁচে রইব, তোতে মোতে শুধু দেখব ওদের কত সব্বোনাশ করতে পারি, ক-টাকে কাঁদাতে পারি। সাতদিন পরে সেই গুন্ডার দল যখন মাঝরাত্রে লোচন দাসের ঘরে হানা দিয়ে তাকে আর তার বাপকে বেঁধে বাড়ির বউ আর মেয়েকে নিয়ে আরেকটা উৎসবের আয়োজন করে তখন তিনশো লোক নিয়ে ভৈরব বাঘের মতো ঝাঁপিয়ে পড়ে, যে কজন এসেছিল প্রায় সকলকেই বাপের নাম ভুলিয়ে দেয়। কী ভীষণ যে দেখায় তখন তার মুখের চেহারা। দেখে বনমালী এবং আরও অনেকে বুঝতে পারে ভৈরবের মেজাজ কোথায় চড়েছে। তাই, পরদিন আবার তাকে মৃদু ও শান্ত দেখে তারা কজন আশ্চর্য হয় না। ভৈরব সায় দিয়ে তেমনই ধীরভাবে বলে, পাবে বইকী, শিগগির পাবে। কড়ায় গণ্ডায় শোধ দিতে হবে, সুদে আসলে। ছোটোবকুলপুরের যাত্রী ২৮৫বাণীর শ্বশুর অবনীর বাবা বুড়ো মানুষ। যত না বুড়ো হয়েছে ভদ্রলোক তার চেয়ে বেশি অকালবার্ধক্য তাকে কাবু করেছে। জেল খেটে খেটে দেশটা স্বাধীন করার পর কোথাও আর পাওা না পাওয়ার মনোবেদনার চাপে। বিরাট বিয়ায়া সত্যযুগীয় ফাঁপা স্বপ্ন আর আদর্শগুলিতে সবোজের চিরদিন অন্ধ বিশ্বাস, ভদ্রলোক কোনোদিন ফাঁকিও চেনেনি, ফাঁকি দিয়ে নিজের জন্য বাগাতেও শেখেনি। আদর্শের ব্যাবসাদারি হাটে তাই তার ত্যাগের মহিমা কানাকড়ি দামেও বিকোল না। বাষট্টি বছর বয়সে অম্বলের জ্বালার সঙ্গে প্রাণের জ্বালা মিশে বেচারিকে তাই অথর্ব করে ফেলেছে। এখন সমস্যা হল, কে যাবে? অবনীর সে বন্ধু, সুতরাং সে গেলেই সবচেয়ে মানানসই হয়, কিন্তু এদিকে মুশকিল হয়েছে যে কেরানি জীবনে অঘটন ঘটতে শুরু করে দিয়েছে। শুধু আপিস গিয়ে কলম পিষে ছুটির পর নিজের ঘর সংসার আত্মীয়বন্ধুর প্রতি প্রাণপণে কর্তব্য করা নিয়ে হিমসিম খেয়ে আর দিন কাটে না। জীবনটাই যাতে টিকে সে জন্য কেরানিপনার রীতিনীতি বিধিব্যবস্থা অর্থাৎ মাসান্তিক মজুরির কিছু উন্নতি সাধনের জন্য বেপরোয়া চেষ্টা শুরু করতে হয়েছে। অবনীর আপিসে কাল ধর্মঘট—অবনী আবার এটা ঘটাবার ব্যাপারে ভালোরকম জড়িয়ে গেছে।
কোনো সম্মানিত বন্ধুকে অভ্যর্থনা করতে গিয়ে নষ্ট করার মতো সময় তার মোটেই নেই। তা সরোজের যদি জ্যোতির্ময়কে এগিয়ে আনতে যাবার আগ্রহ জেগে থাকে কারও কিছু বলবার নেই! নিজের অকারণ নিষ্ক্রিয় উদাসীনতা ঘুচিয়ে যদি নড়েচড়ে বেড়াতে চায় সেটা বরং ভালো লক্ষণ। শুধু বাণী বলে, আপনি একা যেতে পারবেন না বাবা। মন্টুকে সাথে নিয়ে যান। কিন্তু আদর্শ তো তার যাবাব নয়। জীবনে কত উন্নতি করেছে জ্যোতির্ময়, কোথায় উঠে গেছে, তার মতো বড়োমানুষকে উপযুক্ত সম্মান না দেখালে গুবুতর অপরাধ হবে। এও তাব আদর্শেরই অন্তর্গত। সরোজের তাই টনক নড়ে। আজ জ্যোতির্ময়ের আসবার কথা। দিল্লি থেকে প্লেনে আসছে, লিখেছে অবনীদের বাড়িতে এসে উঠবে এবং দু-একদিন থাকবে। অযাচিত সম্মানিত অতিথি। অভ্যর্থনা করে এগিয়ে নিয়ে আসার জন্য একজনের কি এরোড্রোমে যাওয়া উচিত নয়? রান্নার ফাঁকে ফাঁকে বাণী বারান্দায় গিয়ে দাঁড়ায়, ঘামে-ভেজা গায়ে একটু হাওয়া লাগায়। খানিক দূরে রাস্তার ধারে ফাঁকা জমিটুকুতে বস্তির মজুরদের গানবাজনার ছোটোখাটো একটা আসর বসেছে। কী উচ্চগ্রামে ওদের সুর বাঁধা, কী জমজমাট জীবন্ত স্কুল ওদের আওয়াজ। পানেরকতো বড়ো অভদ্রতা হয়? একটা মান্যগণ্য পদস্থ লোক, তার একটা সম্মান নেই? তোমরা কেউ না যাও আমি যাব। বাণীর সঙ্গেও জ্যোতির্ময়ের একদিন পরিচয় ছিল কিন্তু সে গেলে বাড়িতে এ বেলা বাছা করার লোক থাকবে না, পিসিমার অসুখ। তোমরা বলছো কী? কেউ যাবে না? তা কখনো হয়? ট্যাক্সি চেপে আসবে, অসুবিধাটা কি? মণ্টুর বয়স এগারো বছর। সে বাণীর ভাই। তার পিসতুতো ভাই সুব্রত যাবে ছাত্রদের জরুরি মিটিংয়ে। কচি খোকা তো নয়, অবনী বলে, বাড়ি চিনে আসতে পারবে। প্রাণাধিকশখ? খেয়াল? কে জানে কী আছে জ্যোতির্ময়ের মনে। এ কথা ভেবে নেওয়া বাণীর পক্ষে কঠিন নয় যে তাকে স্মরণ করে তার আকর্ষণে জ্যোতির্ময় আসছে, কিন্তু এ রোমান্টিক কল্পনায় তার সুখ নেই বলে কথাটা ভাবতেও তার ভালো লাগে না। তার জন্যই যদি জ্যোতির্ময়ের এ আগমন হয়, সে জানে তার মানে কী। একদিন চেনা ছিল, হয়তো মাঝে-মাঝে কখনও মনেও হয়ে থাকতে পারে যে এ মেয়েটি দেখতে শুনতে মন্দ নয়, দূর থেকে সেই চেতনা মেয়েটিকে ভেবে হৃদয়মনে ব্যাকুলতা জাগায়, জ্যোতির্ময় হঠাৎ তাকে দেখতে আসছে এ কথা কল্পনা করতেও বাণীর হাসি পায়। ঘটনাচক্রে যদি তারই জন্য জ্যোতির্ময় এসে থাকে, তার একমাত্র অর্থ হবে এই যে তার একটা কুৎসিত খেয়াল চেপেছে।
মনে পড়েছে যে বাণীকে দু-একবার লোভনীয় মনে হয়েছে অথচ পারার চেষ্টা করা হয়নি, আজ সে গবির কেবানিব বউ, তাকে দুদিন একটু ঘেঁটে আসা যাক। আগাগোড়া কী ভাবে বদলে গেছে জগৎ। জ্যোতির্ময় শহরে এসে যেচে তাদের বাড়ি উঠতে চাইবে এই কল্পনাতীত সম্ভাবনায় আগে তারা কত উত্তেজনা বোধ করত, বিব্রত হয়ে উঠত। সন্দেহ নেই যে অনেক কিছু প্রত্যাশাও জাগত তাদের। আজ একমাত্র তার ওই বুড়ো পাগলাটে শ্বশুরটি ছাড়া জ্যোতির্ময়কে নিয়ে কারও বিশেষ মাথাব্যথা নেই। আজ শুধু তারা ধরে নিয়েছে যে, এ একটা রহস্যময় ঘটনা, জ্যোতির্ময় এসে ব্যাখ্যা না করলে এ খাপছাড়া ব্যাপাবের মানে বোঝা যাবে না। বালিগঞ্জে তাদের মস্ত বাড়ি সেখানে তার ভাই সপরিবারে বসবাস করছে। শহরে বড়ো বড়ো হোটেলের অভাব নেই, বড়োলোক বন্ধুবও অভাব নেই। তবু জ্যোতির্ময় প্লেন থেকে নেমে সোজা এসে উঠছে তার কেরানিবন্ধুর বাড়ি, অতিথি হয়ে সেই বাড়িতেই দু-একটা দিন কাটাবার ইচ্ছা জ্ঞাপন করেছে। না না, এ খবর রটেনি। ওই যে তুমি লিখেছিলে কাজের চেয়ে দুটো দিন বন্ধুর বাড়ি শান্তিতে বিশ্রামের লোভটা তোমার বেশি, ওটা পড়েই অবনী কাউকে জানায়নি। জানলে দশটা লোক এসে তোমায় বিরক্ত করবে এ কি আমরা জানি না বাবা? তুমি এ গরিবের বাড়ি পা দেবে, লোকের এটা ধারণাও আসবে না। কিছু মনে করার ক্ষীণতম ইচ্ছাটুকুর অস্তিত্বও জ্যোতির্ময় অস্বীকার করে। তাকে বেশ উৎসাহী সানন্দ আত্মপ্রতিষ্ঠ মনে হয়, মন্টুকে চিনতে না পাবার ত্রুটির জন্য তার পিঠ চাপড়ে দিয়ে হেসে বলে, ভারী অন্যায় হল। তুমি তো শুধু ওনার ছেলে নও, তুমি যে আবার অবনীরও ইয়ে, না কি বলো অ্যাঁ? দোকানটার শেডহীন বালব আর রাস্তার বাতি থেকে ওদের আসরে কিছু আলো পড়েছে, কিন্তু ওবা ধার করা আলোকে পর্যন্ত যেন অগ্রাহ্য করতে নিজেদের এক হাত উঁচু একটা কারবাইডের আলো জ্বালিয়েছে, শিখাটা কাত হয়ে লড়াই করছে বাতাসের সঙ্গে। গাড়িতে সে সরোজকে বলে, আমি একটা জরুরি কাজে এসেছি। একটা ভুল হয়ে গেল, অবনীকে লিখে দিতে মনে ছিল না, আমি এসেছি যেন চারিদিকে রটিয়ে না বেড়ায়। সবোজকে জ্যোতির্ময় একটু থামরে দেখে চিনতে পারে, বলে, ও, আপনি? আপনার চেহারা খুব খারাপ হয়ে গেছে। অবনী এল না? একটা সিগারেট বার করে সরোজের প্রায় সাদাটে চুল ও শীর্ণ মুখের দিকে চেয়ে সেটা না ধরিয়েই জ্যোতির্ময় আবার পকেটে রেখে দেয়। তাতে আনন্দের সীমা থাকে না সরোজের।
কিন্তু জ্যোতির্ময়ের মতো উচুস্তরেব লোককে মন্দ ছাড়া অন্য কিছু ভাবাও আজকাল কঠিন। ও জাতটাই বজ্জাত। অবনী একটা জরুরি কাজে গেছে। তুমি কিছু মনে কোরো না বাবা। আগে থাকতে একটা লোককে মন্দ ভাবতে বাণীর ভালো লাগে না। ছোটোবকুলপুরের যাত্রী ২৮৭জ্যোতির্ময় বলে, আপনাকে খুলেই বলি। আমি একটা এজেন্সি খুলব। নিজের নামে তো পারি না, চারিদিকে শত্রু, নানা লোকে নানা কথা বলবে। তাই ভাবলাম, বিশ্বাসযোগ্য কে আছে, কাকে ভার দেওয়া যায়। তখন মনে হল, এত লোকের জন্য এত করেছি, অবনী আমার কতকালের বন্ধু, ওর জন্য কিছুই করা হয়নি। আপনি সারাজীবন কাজ করলেন, শেষ জীবনে আপনারও সুখ হল না। তাই অবনীকেই সব ভার দেব ঠিক করেছি। ওকে আর চাকরি করতে হবে না, আপিসে মাইনে যা পায় আমার কাছে তার বিশ গুণ কমিশন পাবে। বাণীর দিকে সে আশ্চর্য হয়েই তাকায়, কী দেখবে ভেবেছিল আর কী দেখছে, যেন চোখ দিয়েই যাচাই করে নিতে চায়। পাঁচ-ছবছর বিয়ে হয়েছে, কেরানির মেয়ে কেরানির বউ! সে এখনও এমন আঁটো আছে, জীবন্ত আছে! বাণীকে গরিব বাঙালি গেরস্ত ঘরের বিবাহিতা মেয়ের চিরন্তন মাতৃরূপা রূপে না দেখে সে রীতিমতো বিব্রত বোধ করে। সরোজ মনে মনে বলে, ষাট্! তিনিও কর্মী ছিলেন, এও কর্মী, এই বয়সে বেচারি কত সাফল্য লাভ করেছে, টাকাপয়সা মানসম্ভ্রম প্রভাব-প্রতিপত্তি! কিন্তু এরা নীতি জানে না, ব্রত বোঝে না। একটা মোটে মেয়ে, কার জন্য তবে এই তপস্যা? এরা মনে রাখে না যে গান্ধিজিরও সংসার ছিল, পুত্র-সন্তান ছিল; তারপর যখন সময় এল তখন তিনি সন্ন্যাসী। এরা যখন পৌঁছোল, বাড়িতে বাণী তখনও একা, শুধু পিসিমা বিছানায় শুয়ে জুরে ধুঁকছে। সরোজ প্রায় চটে যায়, চেঁচিয়ে বলে, কী আশ্চর্য, এখনও কেউ বাড়ি ফেরেনি! এদের যদি কোনো কাণ্ডাকাণ্ড জ্ঞান থাকে। কীসের এজেন্সি বাবা? সরোজের গলা কেঁপে যায়, চোখে জল এসে পড়ে। এতদিনে —
আশা, আশা একটু বিলাতের দিকে বেড়াতে গেছে। মানে, দেশে কেমন ওর মন টিকল না, একটা সুযোগ জুটে গেল, ও একটু আমেরিকা বেড়িয়ে আসতে গেল। আপিসের ব্যাপার? বিরক্তি কেটে জ্যোতির্ময়ের মুখে স্মিতভাব ফোটে। কেরানির কাছে আপিস কত গুরুতর এটা তার অজানা নয়। মনে মনে বিড় বিড় করে অভ্যস্ত কয়েকটা মন্ত্র আউড়ে অনির্দিষ্ট দেবতার উদ্দেশে যুক্তকর কপালে ঠেকিয়ে সরোজ নিশ্বাস ফেলে। ভগবান তবে ছপ্পড় ফুঁড়েই দিলেনজ্যোতির্ময় তাকে শান্ত করে: আহা আপনি ব্যস্ত হবেন না। কাজে গিয়ে আটকে গেছে, আসবে সময়মতো। বলবখন বাড়ি গিয়ে। বিস্তারিত বলব। ছেলেমেয়ে কটি? ও তার আপিসের ব্যাপার। ২৮৮ মানিক রচনাসমগ্রনাইতে অনেক সময় লাগিয়ে, সম্ভবত নিজের উচ্চতম জগতের অভ্যস্ত হিসাবনিকাশ চালচলন কী ভাবে মানুষের জগতের উপযোগী করে ঢালাই করে নেবে, কয়েক ঘণ্টার জন্য করে নেবে (আটচল্লিশ ঘণ্টা যদি এখানে থাকতে হয়, বাইরে নিজের জবুবি কাজের নামে দশ ঘণ্টা, ঘুমানোর নামে চোদ্দো ঘণ্টা, চিঠি লেখা কাগজ পড়া চিন্তা করার নামে দশ ঘণ্টা যাবে। তবু চোদ্দো ঘণ্টা থাকে ঘরোয়া সামাজিক জীবনের জন্য। অসুস্থতার ভান করে আরও ঘণ্টা দশেক কাটানো ছাড়া উপায় নেই। অন্যভাবে ছাঁটাই করে টোটালটা আরও কিছু কম করা যায় কি? বোধ হয় এরা ভডকে যাবে। বন্ধুত্ব, প্রীতি, আদর্শ, নীতি, মানবতা ইত্যাদি ভান তো চাই, সবোজের ছেলেকে চাকরি ছাড়িয়ে চোরা কারবাবে নামাতে হবে। তার জীবনে, তার পরিবারে এটা প্রায় বিপ্লবের সমান। সেটা ঠিক করে সবল সহজ হাসিখুশি হয়ে জ্যোতির্ময় বারান্দায় জেঁকে বসে। বলছি না? একটা ছোঁডাকে বিনি পযসায মেয়ে সাজিয়ে ওবা নাচাচ্ছে, গান কবাচ্ছে, চেয়ে দেখো কী জমজমাট আসব। আমবা যে মেয়েটাব গান শুনে একটু মাতব, সে মেয়েটাব বাপকে একটা খাতিবি চাকবি দিতেই হবে। মেয়েটাকে শান্তিনিকেতনে পড়িয়ে ঘুবিয়ে আনতে হবে। বেডিযো সিনেমায নাম করাতে হবে। গান তো আসলে অষ্টবস্তা, কাজেই নাম-টাম কবিযে নিযে না শুনলে তো মাতলামি আসবে না। একটা বোমাঞ্চকব গান শুনতে আমাদের হাজাব কেন, তাব বেশি খবচা হয। দূরে এক হাত কারবাইড লাইটের আলোয় মজুরদের গানের আসবের দিকে চেয়ে বলে, ও ব্যাটাদেবই আজকাল ফুর্তি। স্ট্রাইক করে কবে মোটা মজুরি কামাচ্ছে, সস্তায় ফুর্তি করছে। লোকে আমাদের প্রফিটটাই দ্যাখে। একখানা গান শুনতে আমাদের যে হাজার টাকা খরচ সেটা কেউ হিসাব করে না। হেসো না বাণী, ঠিক কথাই বলছি। জলের বড়ো অভাব।
সব জিনিসেরই অভাব—কেবানির বাড়ি তো! কথাটা বাণী না বলতেও পারত। জ্যোতির্ময় এ সব হিসাব করেই এসেছে, বড়ো একটা মোটা লাভের গোপনীয় ব্যবস্থার জন্য একটা দুটো দিন এ সব কষ্ট অসুবিধা সইতে সে নারাজ নয়। জ্যোতির্ময়ের অস্বস্তি বাণী টেব পায়। কথাটা হালকা করে উড়িয়ে দিতে সে বলে, ওব বেডানোর ভাবনা কি? সাধ হলে বেরিয়ে পড়লেই হল। জামাকাপড় ছাড়ুন, চান করবেন? বিশেষ চেষ্টায় দু বালতি জল রেখেছি। সবোজ বাণীকে আডালে ডেকে নিয়ে বলে, শোনো, তোমাকে একটা কথা বলি। একটু হিসেব কবে কথাবার্তা বোলো। অবনীব একটা ব্যবস্থা কবে দেবে বলেছে, যা-তা বলে ওব সর্বনাশটা কোবো না। হয় না। যাব মেয়ে বা বউ গান শোনাবে সেও সব জানে বোঝে কি না। সব কল টিপে হয়। কল টেপাটাই আসল। এমন যখন কাহিল অবস্থা, বাণী হেসে বলে, ও কল আপনাদের বিগডে গেছে। আর কাজ দেবে না। প্রাণপণ উদাবতায় সবোজ ক্রোধ সংবরণ করে। এবা কিছু জানে না বোঝে না মানে না। এদেব আধ্যাত্মিক জীবনে এমন দৈন্য যে স্বার্থপবের মতো সর্বদা সব বিষয়ে স্বামীর সঙ্গে নিজেকে জড়িয়ে ভাবে। আমার কিছু হোক বা না হোক স্বামীর আমার ভালো হোক এ চিন্তাও এদেব আসে না। আমি আপনার ছেলের সর্বনাশ করব? তাতে আমার লাভ কী বাবা? না শুনলেই হয়? বিশেষ চেষ্টা কেন? বলছেন না কি?
ছোটো ঘরে বাণীরা থাকে, জ্যোতির্ময়ের কাছে চাদর চেয়ে নিয়ে বাণী সে ঘরে বিছানা করে দেয়, বলে, খাটে হাত-পা ছড়িয়ে বসুন, যা চেয়ার বাড়িতে! কষ্ট পাবেন অনেক। বাণী তার মুখের ভাব লক্ষ করে ভরসা দিয়ে বলে, ভাববেন না, বাড়িতে এসেছে মানুষটা, আমি প্রাণ দিয়ে আদরযত্ন করব। জ্যোতির্ময়ের সঙ্গে কথা বলতে বলতে সবে অবনী জামাকাপড় ছেড়েছে, সে ফিরেছে টের পেয়েই সরোজ তাকে ব্যগ্রভাবে আড়ালে ডেকে নিয়ে যায়। বাণী যখন মেয়ে পড়াতে গিয়েছিল সেজ্যোতির্ময়ের চোখে সংশয় ঘনিয়ে আসে। —ও বাবা, ও সবে যায় না কি? একটু ভেবে বলে, যাক গে, ও পেটি চাকরিও আর করতে হবে না, স্ট্রাইকেরও দরকার হবে না। ছেলেমেয়ে হয়নি? জ্যোতির্ময় হঠাৎ জিজ্ঞাসা করে। তার আসল কৌতূহলটা কী বাণীর তা বুঝতে কষ্ট হয় না, কারণ চোখ দিয়ে তার সর্বাঙ্গে কৌতূহলটার জবাব সে খুঁজছিল। বেশ তো তোমাদের সঙ্গে নয় কষ্টই পেলাম। জ্যোতির্ময় আশ্চর্য হয়, ক্ষুণ্ণও হয়। কাল স্বামী চাকরি ছাড়বে, মাসে পাঁচ-ছশোটাকা রোজগার শুরু করবে, তার খাতিরেও সে একবেলা মেয়ে পড়ানো কামাই করতে সাহস পেল না। এ প্রশ্নের আর জবাব কী? বাণী চুপ করে থাকে। বাণী ধীরকণ্ঠেই বলে, একটা চিকিৎসা ছিল। তাতে বহু টাকা লাগে, জোগাড় করা গেল না। জ্যোতির্ময়ের মাথা একটু নামে, দৃষ্টি মেঝেতে নেমে যায়। আমায় লিখলে না কেন? অবনীর যদি মাসে পাঁচ-ছশোটা টাকা রোজগার হয়, খুশি হবে? জ্যোতির্ময় চোখ তোলে, কালকেই সব ব্যবস্থা করে দেব। নাম থাকবে সরোজবাবুর, ওঁর নামের একটা বিশেষ ইয়ে আছে। দেখাশোনা সব অবনীই করবে। কালকেই ও রিজাইন দিয়ে দিক। স্ট্রাইক ফাইক করছে। হবো না! কী বলেনকেন? ঠিক হল। সবাই একমত। রিজাইন বোধ হয় দিতে হবে না, এমনিই তাড়িয়ে দেবে। ২৯০ মানিক রচনাসমগ্রঅবনীর ফিরতে রাত প্রায় নটা বেজে যায়। বাণী সাগ্রহে জিজ্ঞাসা করে, কী হল? অবনী বাণীর দিকে তাকায়ে। বাণী যেন জানত সে এই ভাবে তাকাবে, পাশের দিকে সরোজের চোখের আড়ালে সে দাঁড়িয়েছিল। নীরবে ঠোঁট কামড়ে বাণী চোখের ইশারায় সরোজকে দেখিয়ে দেয়। ইঙ্গিতটার মানে বোঝা সহজ। ধৈর্য হারালে চলবে না, ব্যস্ত হলে চলবে না, বুড়ো বাপটা যখন আছে তার অস্তিত্বটাও মানতে হবে। অবনীর শান্ত চোখে বিপজ্জনক অসহিষ্ণু ক্রোধ জ্বলে উঠছিল, বাণীর ইঙ্গিত না পেলে সে হয়তো ভুলেই যেত আসল কারসাজি কার, অসহায় নিবুপায় বাপকে দাবড়ে
সরোজ জ্যোতির্ময়ের বেনামি এজেন্সির ব্যাপারটা ছেলেকে খুলে বলতে শুরু করে। অবনীর শ্রান্ত ক্লান্ত মুখ দেখে আলোচনাটা খাওয়ার পর আবম্ভ করার কথা বলতে গিয়ে বাণী ঠোঁট কামড়ে চুপ করে যায়। খিদের কষ্ট অবনীর সইবে, কিন্তু একটু শান্ত হতে না পারলে যে কোনো মুহূর্তে বুড়ো মানুষটার হার্ট ফেল করা আশ্চর্য নয়। সেইখানে একটা মাদুর বিছিয়ে বাণী দু হাত ধরে সরোজকে বসিয়ে দেয়, বলে, বসে কথা বলুন বাবা, ব্যস্ত হবেন না। সরোজ এই বলে, শেষ করে, সারা জীবন আমি নীতি আর আদর্শ বাঁচিয়ে এসেছি, এতে কোনো দোষ দেখলে আমি নিজেই বারণ করতাম। মানুষের নীতিধর্মী অন্তরে, বাইরেটা দেখলেই শুধু চলে না। তুমি যেন জ্যোতির্ম্ময়কে না বলে বোসো না। রাগে দুঃখে তাব চোখে তখন প্রায় জল এসে গিয়েছে। খিদেয় মানুষ মরে যাক, জীবন অচল হয়ে আসুক, এমান সব দুর্বলতা বাধা হয়ে মানুষকে ব্যস্ত হতে দেবে না, তাড়াতাড়ি কিছু করতে দেবে না। সময় জ্যোতির্ময়ের সঙ্গে তার এজেন্সি সম্পর্কে আরও আলাপ হয়েছে। সমস্ত ব্যাপার জেনে সরোজের যেমন হয়েছে ভয় তেমনি বেড়েছে উত্তেজনা। নিজে আগে ছেলের সঙ্গে বোঝাপড়া না করে জ্যোতির্ময়ের সঙ্গে তাকে আলাপ আলোচনা করতে দিতে সে রাজি নয়। এজেন্সির প্রস্তাবে সায় দিতে ছেলের নতুন বিবেকে বাধবে বলেই সরোজের ভয়, সোজাসুজি হয়তো সে জ্যোতির্ময়কে বলে বসবে: আমি তোমার ওই লোকঠকানো ব্যাপার নেই। ওই তো, ওই তো দোষ তোমার! ক্ষুব্ধ অভিযোগের সুরে সরোজ বলে। কিন্তু অভিমান সাধারণ হৃদয়াবেগ, মোটেই মারাত্মক নয়। সারা জীবনের ত্যাগ স্বীকারের পুরস্কার যেচে ঘরে এসেছে অথচ ছেলে তা বাতিল করে দেবে, এই আতঙ্কে যে কাঁপুনি ধরেছিল সরোজের তা কেটে গেছে। ক্ষুব্ধ হোক আর অভিমান করুক, এখন সে শান্ত হয়েছে, আচমকা তার হার্ট ফেল করে মরার সম্ভাবনা নেই। কী ভয়ংকর মুহূর্তটা যে কেটে যায় বোঝে শুধু বাণী আব অবনী। ঘৃণার মতো প্রচণ্ড মহৎ হৃদয়াবেগকে যুগে যুগে যারা অনেক কাযদায় বিপথে উলটো দিকে চালিত করে ঘরে ঘরে ভুল-বোঝাতাহলেই সর্ব্বনাশ। জ্যোতির্ময় ঠকাবে মানুষকে, লোকচক্ষুর আড়ালে সে হাজার হাজার টাকা ফাঁকি দিয়ে বাগাবার ব্যবস্থায় কাজে লাগাবে সবল বোকা অসহায় সরোজ আর তার গরিব কেরানি ছেলে অবনীকে, আর একটু হলে আড়ালের মানুষ তাকে আড়ালেই রেখে ফাটাফাটি হয়ে যেত সরোজ আর অবনীর মধ্যে। শোনো তবে বলি—জ্যোতির্ময় তোমায় বলেছে কিছু? উত্তেজনায় হাত-পা কাঁপছে সরোজের, কথা জড়িয়ে যাচ্ছে।
কখন বলবে? অবনী মৃদু শান্ত স্বরে বলে, আপনি যদি জোর করেন আপনি যা বলেন তাই হবে। আমি আপনার বিরুদ্ধে যাব না। কিন্তু আমি ভাবছি, আমার ভালোর জন্যই আপনি এটা করতে বলছেন। সবার কাছে হীন হয়ে আমার সুখ শান্তি যদি নষ্ট হয়, আপনি কি সুখী হতে পারবেন? ছোটোবকুলপুরের যাত্রী দুবার নাক ঝেড়ে, বাণীর কাছে এক গ্লাস জল চেয়ে নিয়ে কয়েক ঢোঁক জল খেয়ে সরোজ বলে, তোমার ঠেকছে কীসে? এ তো চুরি-চামারির ব্যাপার নয়, সাধারণ ব্যাবসার কথা। কেউ না কেউ এজেন্সিটা পেত, এজেন্সি দেওয়ার ব্যাপারে জ্যোতির্ময়ের হাত ছিল, সে অন্যকে না দিয়ে তলে তলে নিজের জন্য ব্যবস্থা করেছে। এটা একটু অন্যায় বটে, দেশের লোককে জানানো হল একরকম কাজে হল অন্যরকম। কিন্তু বিশেষ কী এসে গেছে? অন্য লোকেও এজেন্সিটা চালাত, জ্যোতির্ময় নিজের লোক দিয়ে সেটা চালাবে। এজেন্সি চালানোটাই আসল কথা। তাতেই দেশের মঙ্গল। এতে তোমার আপত্তি কী? আশেপাশের তিন চারটে বাড়িতে রেডিও বিনিয়ে বিনিয়ে গানের নামে কাঁদছে। তবে সুখের বিষয়, এ কাঁদুনি ঢোল করতাল ঘুঙুর আর সমবেত গলার আওয়াজে খানিকটা চাপা পড়ে গেছে। অবনী বলে, এক কাজ করা যাক। জ্যোতি আপনার নামে এজেন্সি করতে চায়, তাই করুক। আপনি মাইনে দিয়ে লোক রাখুন, এজেন্সি চালান। আমি নাই বা রইলাম ওর মধ্যে। খাদ্য দেখে রীতিমতো ক্রোধের সঞ্চার হয় জ্যোতির্ময়ের, যদিও তার জন্যই বিশেষভাবে সরোজ এক পোয়া মাছ আনিয়েছিল এবং মাছটা বেশির ভাগ তাকেই দেওয়া হয়েছে। তবে রাগ করে যেখানে লাভ নেই সেখানে জ্যোতির্ময় রাগ চাপতে জানে। তাব শুধু লাভের হিসাব। বিনা লাভে রাগ দুঃখ খরচ করাও তার স্বভাব নয়। পিসিমা তেমনই মৃদু স্বরে বলে, বেরোবার আগে অনেকক্ষণ কপাল টিপে দিয়ে গেল। তখনই বুঝেছি মিটিংয়ে গোলমাল হতে পারে, নইলে মার জন্য ছেলের অত দরদ হয়! নাও ফিরতে পারে ভেবে গেছে। বাণী বলে, ওটা পুঁই-চচ্চড়ি। জানেন, পুইশাক ছিল বলে বাঙালি বেঁচে আছে। ভাতের বদলে কচু আর মাছ-মাংসের বদলে পুঁই। কচু আর পুঁই না থাকলে—জবাব শুনে তার মুখ আরও পাংশু হয়ে যায়। কিছুক্ষণ ভাত গিলতে পারে না। বারবার চোখ তুলে সে বিধবা পিসিমার শীর্ণ কিন্তু শান্ত মুখখানার দিকে তাকায়। বাণী বলে, না পিসিমা, এখনও ফেরেনি। কুচো চিংড়ি বাদ দিও না। —অবনী বলে। বাঃ! লাউ শাকটা তো খাসা হয়েছেতাদের খাওয়া শেষ হতে হতে সলিল বাড়ি আসে। বলে, বাঃ, সবাই পেট-পূজায় লেগে গেছ।
জ্যোতির্ময়ের মতো মহৎ ব্যক্তির উপস্থিতি তাকে মোটেই বিব্রত করেছে মনে হয় না। আধ ময়লা পাঞ্জাবিটা গা থেকে খুলে হাত ধুয়ে একটা আনন টেনে বসে পড়ে বলে, চট করে থালা আনো বউদি, আগে খাব তার পর অন্যকথা। এখনও ফেরার সময় যায়নি। চাদর গায়ে জড়িয়ে পিসিমা ধীরে ধীরে ঘরে এসে দরজার কাছে দেয়াল ঘেঁষে বসে। ধীরে ধীরে বলে, সলিল আসেনি, না? পিসিমা নীরবে মাথা হেলিয়ে সায় দেয়। এদিকে জ্যোতির্ময়ের মুখ হঠাৎ বিবর্ণ দেখায়। সলিল কে? কীসের মিটিং? জ্যোতির্ময় খিলখিল করে হেসে ওঠে। কী করবে কী বলবে সে ভেবে পাচ্ছিল না। সরোজ নিশ্বাস ফেলে বলে, ভেবে দেখি। তোমরা খাবে যাও। আমি আজ কিছু খাব না বউমা। বাণী চট করে সামনে আসে। —না খাওয়াই ভালো। পাতলা একটু বার্লি করে রেখেছি, চুমুক দিয়ে খেয়ে শুয়ে পড়ুন। ২৯২ মানিক রচনাসমগ্ররাত্রে শুতে যাবার আগে বাণী একবার সরোজের খবর নিতে যায়। শ্রান্ত অবনী আগে শুয়ে প্রায় ঘুমিয়ে পড়েছিল, বাণীর হাতের নাড়ায় জেগে উঠে তার মুখ দেখেই সে খানিকটা বুঝতে পারে। নিঃশব্দে গিয়ে দুজনে সরোজের চৌকিতে বিছানো সামান্য সাধারণ বিছানার পাশে দাঁড়ায়, সামান্য ইঙ্গিতটুকু পাবে না জেনেও অবনী জীবনের সন্ধান করে। বাণীর দু চোখে জল গড়িয়ে পড়ে। ঘুমের মধ্যে বুড়ো সরোজ চিরতরে ঘুমিয়ে গেছে। ভাতের থালা সামনে পাওয়া মাত্র সে খেতে আরম্ভ করে, কোনো দিকে তাকায় না। জ্যোতির্ময় যেন আশ্চর্য হয়ে এই পুঁজি-করা প্রাণবন্ত প্রচণ্ড ক্ষুধার অভিব্যক্তি চেয়ে দ্যাখে। অবনীর খাওয়ার রকমে সে জোরালো খিদে দেখেছিল, তবে এতটা নয়। তার বোধ হয় বিশ্বাস হয় না যে, ভদ্র ঘরেও এত খিদে পায় এবং সে খিদে চেপে রাখতে হয় রেশনের নির্দিষ্ট অন্নের জন্য। বাণী খেয়ে উঠে শোনে, সলিল ট্যাক্সি ডাকতে গেছে। জ্যোতির্ময় জিনিসপত্র গুছিয়ে নিয়েছে। ট্যাক্সি এলে একটা প্রকাণ্ড সমস্যা দেখা দেয়। সরোজের বোধ হয় ঘুম এসেছে, তাকে না জানিয়েই কি জ্যোতির্ময় চলে যাবে? জ্যোতির্ময় হাসবার চেষ্টা করে, বলে, ভেবেছিলাম হোটেলেই উঠব, সেখান থেকে এসে তোদের সঙ্গে দেখা করে যাব। তোর বাবাকে দেখে সব ভুলে গেলাম। এত দিন পরে তোদের সঙ্গে দেখা, কী ভালোই যে লাগছে। হোটেলের কথাটা স্রেফ ভুলে গেছিজিনিসপত্র নিয়েই যাব। আমার কি আব বিশ্রাম আছে? তোমাদেব চিঠি লেখবার পর এটা ঠিক হয়, খুব সিরিয়াস ব্যাপার। আমাকে হোটেলেই যেতে হবে, সকালে কজন বড়ো বড়ো লোক আসবে, জরবি কনফারেন্স।
কিছুক্ষণ সলিলের সঙ্গেই সকলে কথা কয়, জ্যোতির্ময়কে তারা যেন ভুলে গেছে। শরীরটা দুর্বল বোধ করে সরোজ শুয়ে পড়েছিল, এখানে উপস্থিত থাকলে তার হৃৎস্পন্দন বোধ হয় বন্ধ হয়ে যেত। জ্যোতির্ময়ের মুখে গভীর চিন্তার ছায়া নেমে এসেছে। খেয়ে উঠে সিগারেট ধরিয়ে সে উসখুস করে। নাক ঝাড়ে, গলা খাঁকারি দেয়, নড়েচড়ে নানাভাবে বসে, হাতের তালু দিয়ে নিজের থুতনি ঘষে। টায়ারড নয়। ভাবছি, তোমাদের বড়োই অসুবিধা করলাম। ঘরের এত টানাটানি জানলে আমি—তবু জ্যোতির্ময় উশখুশ করে। গ্লাস জল খেয়ে নামিয়ে রাখা জ্বলন্ত সিগারেটটার কথা ভুলে নতুন আরেকটা সিগারেট ধরায়। টায়ারড লাগছে? তুমি বরং তবে শুয়ে পড়ো। অবনী বলে। অবনী বলে, মিটিং কেমন হল? গ্র্যান্ড। পরশু জয়েন্ট প্রসেসন। আমাদের কোনো অসুবিধে নেই, ভেটো না। অসুবিধা তোমারই। অবনী বলে, তাই তো দেয়। শুনে স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে জ্যোতির্ময় ট্যাক্সিতে ওঠে। ট্যাক্সি চলে গেলে বাণীও স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে বলে, বাঁচা গেল বাবা। নিজেই আমাদের সমস্যা মিটিয়ে দিল। অবনী বলে, ওবাণী জ্যঃ কুঁজো আর গ্লাস এনেছিল, সে বলে, আমাদের অতিথি আসে না? আচমকা সে বলে, একটা ভুল হয়ে পড়ে, ইস! আমায় তো ভাই যেতে হবে। আমরা বুঝিয়ে বলব। এমনি ভালো ঘুম হয় না, ঘুম যখন এসেছে ওঁকে আর জাগিয়ে কাজ নেই। বেরোবে? তা বেশ তো। ফিরতে, সে বাটে হবে না কি? ছোটোবকুলপুরের যাত্রী ২৯৩গরিব মানুষের হোটেল, যারা খেতে আসে তারা অধিকাংশই কারখানা আপিসের মজুর কেরানি। একপ্রস্থ ভাত, ডালের জল আর সবুজ একটা ঘন্টা আজকালকার বাজার হিসাবে মোটামুটি সস্তা। পাইস সিস্টেম প্রচলিত, গাঁটে কড়ি কম থাকলে আধপেটা সিকিপেটা খেতে বাধা নেই। পেটে অন্তত ভাত পড়েছে এ সান্ত্বনাটুকু কেনার সাধ্য এখানে হয়, খিদের সঙ্গে বোঝাপড়া জল দিয়েই করতে হোক। মাছ মাংস পাওয়া যায়, চড়া দাম। অবসাদ বোধ করলে, বড়োলোকের মিথ্যা প্রতারণা ভরা কুৎসিত জগতের ছড়ানো মায়াজালের ছোঁয়াচ লেগে লেগে নিজেকে ক্লেদাক্ত অশুচি মনে হলে, এইখানে এসে বসি। এই মলিন নোংরা পরিবেশে মজুর কেরানির খাদ্য আর খাওয়ার রকম দেখতে দেখতে জগতের সীমাহীন দুর্দান্ত অতৃপ্ত ক্ষুধার অস্তিত্ব অনুভব করি। অসংখ্য চেতনায় তারই প্রতিফলন ঘৃণা-যজ্ঞের মহান পবিত্র আগুন হয়ে অনির্বাণ জ্বলছে, নিজের চেতনায় তার উত্তাপ পাই। নিজেকে সুস্থ, শুচি মনে হয়। মুখে বলে, ঝগড়াঝাঁটি? ঝগড়াঝাঁটিই বটে!
কদিন আজ বাড়িতে পারিবারিক, সামাজিক, দাম্পত্য, রাজনৈতিক, আধ্যাত্মিক যত রকম লড়াই আছে সব চলছে—শুধু সাম্প্রদায়িক যুদ্ধটা বাদ। বাড়িতে আজ ও পক্ষের হাঙ্গার স্ট্রাইক, রাঁধেনি। আগে থেকে নোটিশ দিয়েছে আজ আপিস না গেলে বরখাস্ত করবে। বাড়ির সকলে তা জানে। এ বাজারে চাকরি পাব? না খেয়ে মরতেই হবে সকলকে। উপোস করিয়ে মারতেই হবে যখন চাই সকলকে, তাই যখন আমার প্রাণের ইচ্ছা, এত বেলায় পশুপতি আপিস যায়নি এটা আমার বিস্ময়ের কারণ নয়, আমি জানতাম তাদের আপিসে আজ ধর্মঘট। কাছাকাছি একটা ভাড়াটে বাড়িতে পশুপতি সপরিবারে বাস করে। বাড়ি এত কাছে তবু এত বেলায় সে হোটেলে ভাত খেতে এসেছে কেন এটাই আমার কাছে অত্যন্ত খাপছাড়া ঠেকল। প্রায় তখন সাড়ে এগারোটা বাজে। সকাল থেকে এঁটো থালাবাটি তুলে তুলে ন্যাতা বুলিয়ে যাওয়ার ফলে খাওয়ার ঘরে বিছানো আসনগুলির সম্মুখে মেঝে চ্যাপচেপে কাদাটে হয়ে গেছে। খাদ্যার্থীদের ভিড় এখন কম। খেতে বসব কিনা ভাবছি এমন সময় আশ্চর্য হয়ে দেখলাম, পশুপতি জুতো খুলে খাওয়ার ঘরে একটা আসন দখল করে বসল। আমিও পাশের আসনে বসি, ভাত দিতে বলি। ইতিমধ্যেই পশুপতির খাদ্য এসে গিয়েছিল, হোটেলের ঠাকুর অদ্ভুত রকম চটপটে হয়। পিতলের বাটিতে মশলা গোলা জলের মধ্যে পেন্সিলের দাগ তোলা রবারের মতো মাছের টুকরোটির দিকে চেয়ে পশুপতি বলে, ছ আনার এই মাছসে শান্ত উদার চোখে তাকায়, ঠোঁটের কোণে মৃদু একটু করুণার হাসি ফোটে। বুঝতে পারি সে ভাবছে: এ লোকটা কোন জগতে বাস করে! শখের কলহ আর ভাতের উপর গোসা! ও সব ন্যাকামির দিন কোন কালে পার হয়ে গেছে মধ্যবিত্তের জীবনে সে খবরটাও রাখে না? মানুষকে উত্তপ্ত করলে তার ভাষার জড়তা কেটে যায়। আমি ইচ্ছা করেই হালকা সুরে বলি, বাড়িতে ঝগড়াঝাঁটি হয়েছে, তাই বুঝি চিরকেলে প্রথায় ভাতের উপর রাগ করে বেরিয়ে এসেছ? পশুপতি নিশ্বাস ফেলে বলে, অসুখ নয়, যুদ্ধ। কদিন ধরেই চলেছে, আজ চরম সংঘাত। এক পক্ষে আমি অপর পক্ষে বাড়ির সবাই। মাঝে মাঝে এই হোটেলে খেতে আসি। বিলাসিতার দাম দেবে না? হোটেলেরও তো মালিক আছেতা হোটেলে কেন, বাড়িতে রান্না হয়নি? অসুখ নাকি? ## ঘর করলাম বাহিরতুমি বুঝবে না। --মুখের কাছ থেকে ভাতের গেরাস নামিয়ে সে বলে—আমি চিরদিন স্বাধীনতা চেয়েছি, চিরটা কাল আমি সবার চেয়ে পরাধীন হয়ে রইলাম। কী ভাবি আর কী হয়। কী চাই আর কী পাই। কলেজে পড়বার সময় ভেবেছিলাম ডাক্তার হব, শেষ পর্যন্ত হলাম কেরানি।
তাও বাবার চেষ্টায়, আমার নিজের গুণে নয়। জানোই তো কী অবস্থা হয়, ভবিষ্যতের স্বপ্ন না ছাই, যেমন তেমন একটা উপার্জনের ব্যবস্থার জন্য পাগল হয়ে উঠতে হয়। চাকরির জন্য হন্যে হয়ে উঠেও আমি কিছু করতে পারিনি, বাবা ধন্না দিয়ে ধরাধরি করে চাকরিটা জুটিয়ে দেন। আজ আমার �াণ্ডে বাবা স্তম্ভিত হয়ে যাবেন এ আর আশ্চর্য্য কী? প্রথমেই কী বললেন জানো? বললেন, আমি উমেশবাবুকে মুখ দেখাবে কী করে! মনে হল যেন কেঁদেই ফেলবেন। উমেশবাবু চাকরিটা দিয়েছিলেন। কাজেই আমি কত বড়ো অকৃতজ্ঞতার কাজ করছি, কত বড়ো অন্যায় করছি! বাবা খুব নিষ্ঠাবান লোক। এখনও খদ্দর পরেন। মিনিটখানেক সে নীরবে খেয়ে যায়। আচমকা একটু অদ্ভুতভাবে হাসে: কত তর্ক, কত বোঝানো, কত হা-হুতাশ মান অভিমান। তবে দেশপ্রেম, শিশুরাষ্ট্র এ সব যুক্তি তোলেননি, আমারও তো বয়স হয়েছে বোঝেন। তাঁর একটা যুক্তি হল, আমি প্রায় অফিসার—একটুখানি নীচে। লেগে থাকলে পেটি অফিসার হতে পারব। যারা পঞ্চাশ ষাট টাকার কেরানি, তারা যা খুশি করুক, আমি কেন তাদের দলে ভিড়ব? আসলে এ সব যুক্তিতর্ক বড়ো কথা নয়, ঘরোয়া ব্যাপার তো। মায়া মমতা স্নেহের দাবির চাপটাই মারাত্মক। বাড়িতে যেন গভীর শোকের ছায়া পড়েছে, সর্বনাশ আসন্ন। দিবারাত্রি কানের কাছে শুধু গুঞ্জন, কী উপায় হবে? হায়, হায়, উপায় কী হবে? বোনের বিয়ে আসছে, আমার স্ত্রীর সাত মাস, বাবার অসুস্থ শরীর—ব্যাপারটা এতে পরিষ্কার হয় না। পরিবারটি উলঙ্গ হয়ে উপোস দিয়ে মরার অবস্থার মুখোমুখি পৌঁছায়নি, এই পর্যন্ত। কিন্তু জীবনের সমস্ত সাধ আহ্লাদ আশা আনন্দ সার্থকতা বৈচিত্র্য বিকাশের সম্ভাবনা ছেঁটে ফেলে ডালপালা বর্জিত গাছের মতো বেঁচে থাকা তো এমন লোভনীয় নয় যে পরিবর্তনের চেষ্টাতেই ভীত হয়ে উঠবে তার আত্মীয়স্বজন। তার মুখ আলগা করার জন্য আরও একটা খোঁচা দিই, বলি, তোমার যদি কিছুমাত্র মনের জোর থাকত—শুকনো ভাতের একটা গেরাস মুখে দিয়ে বাটিতে চুমুক দিয়ে সে একটু ডাল মুখে নেয়। এত পাতলা ডাল যে মেখে খাওয়া সম্ভব নয়। তার হাত একটু কাঁপছিল। কল্পনায় তার বাড়ির দৃশ্যটা রূপ নিয়ে আমাকেও সচকিত করে দেয়। পরিবারের একমাত্র উপার্জনশীল মানুষটির বিরুদ্ধে এ তো প্রায় সমগ্র পরিবারটির সংঘবদ্ধ আক্রমণ এবং সকলেই তারা ওই মানুষটির উপর নির্ভরশীল। তবু ব্যাপারটা বড়ো বেশি বাড়াবাড়ি মনে হয়। একটু যেন অবাস্তব, অস্বাভাবিক ঘেঁষা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
আজকের দিনে কে না ধর্মঘট করে, না করে উপায় আছে কার? মা বাবা মাসিপিসি ছেলেমেয়ে বউ নিয়ে বেঁচে থাকার দায়ে ঠেকেছে বলেই কেরানি মরিয়া হয়ে লড়াইয়ে নামে, ওটা তার শখ নয়। তার মানেই তো এই যে বাড়ির অন্য সব মানুষের জীবনযাত্রাও অতি শোচনীয় অবস্থায় এসে ঠেকেছে। আজ থেকেই উপোস শুরু হোক! দুদিন আগে আর পরে। মা বাবা পিসিমা বউ সবাই সকাল থেকে বিছানায় শুয়ে হা-হুতাশ করছে, চোখের জল ফেলছে। আড়চোখে আড়চোখে দেখছে নটার মধ্যে গুড় মুড়ি খেয়ে গুটিগুটি আপিস রওনা দেওয়ার আয়োজন করছি কি না। একদিনে এই শোচনীয় অবস্থা সৃষ্টি হয় না, ক্রমে ক্রমে দুর্দশা বাড়ে এবং তাতেই বাড়িতে কমবেশি সমর্থন সৃষ্টি হয়ে যায়। এমন তো নয় যে আপনজনকে বাদ দিয়ে, তাদের ভালোমন্দের হিসেব শিকেয় তুলে, শুধু নিজের জন্য নিজের খেয়ালে পশুপতি আজ আপিস যায়নি। ধর্মঘট তো ডিটেকটিভ উপন্যাস পড়াব অ্যাডভেঞ্চার নয়। এই দেড়শোর মতো। কত মাইনে পাও? ছোটোবকুলপুরের যাত্রী ২৯৫খাবার ঘরে লোক চলাচল করে আর হোটেলের মাছির ঝাঁক ভনভনিয়ে উড়তে থাকে। রান্নাঘরে ঠাকুর আর ঝিয়ের মধ্যে কী নিয়ে কলহ বেধেছে, ঝির তীক্ষ্ণ চড়া গলা ঝনঝন করে বাজছে। চিরদিন উপরের মিতালির ভরসাটুকু সম্বল করে শূন্যে ঝুলে থাকা মধ্যবিত্তের চেতনায় ফাঁস ছিঁড়ে আছড়ে পড়ার আতঙ্ক যে কত সহস্র রূপে পুঞ্জীভূত হয়ে ছিল, নীচের ওই নিবিড় কালো হতাশার অতল গভীরতার দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে রাখার করুণ চেষ্টাতেই কীভাবে ব্যর্থ ব্যাহত জীবন কাটত, পশুপতি তার বর্ণনা দিতে পারে না। ছেলেবেলাতেই এই ভয় আর ভয়ের সংস্কার দেখে ভয় পেয়ে মাটির মানুষের কাছে পালিয়েছি সাহস খুঁজতে, তার অপটু কথা থেকেই কল্পনা করে নিতে পারি কীসের ইঙ্গিত সে করছে। কিন্তু আজও কি এত ভয় আছে? দ্বিধা আছে, সংশয় আছে, বিভ্রান্তির হতাশা আছে কিন্তু এত আতঙ্ক? দু-একজনে� � থাকতে পারে, সমগ্র পরিবারটির কী করে থাকে? কেউ একজন চেষ্টা করে ফেনিয়ে ফাঁপিয়ে না তুললে এ তো সম্ভব নয়আমার মনের প্রশ্নের জবাব দিতেই যেন পশুপতি বলে, স্ত্রী গোড়ায় আমার দলেই ছিল। অন্দরে থাকলেও বাইরের খবর তো কিছু কিছু পায়, আমরা যা ভাবি আর অনুভব করি দাম্পত্যালাপে কিছুটা তো চুঁইয়ে গিয়ে মর্মে পৌঁছায়। খানিকটা বুঝত যে এটা আমার একার ব্যাপার নয়, আপিসের সবাই মিলে করছি। কিন্তু বউটাও শেষে বিগড়ে গেল। বেচাবির সাত মাস, কানের কাছে সকলে ক্রমাগত মন্ত্র জপছে, কতক্ষণ ভরসা রাখবে?
বাবা বোধ হয় টের পেলেন, একা আমার সঙ্গে পেরে উঠবেন না। আমার দিদিকে নিয়ে এলেন। বেশ মোটাসোটা জবরদস্তি গিন্নিবান্নি, ছেলেপিলে নিয়ে সচ্ছল সংসার, খুব সাংসারিক বুদ্ধি। সবাই মিলে কী যে বোঝাল, বউটিও আক্রমণ শুধু কবে দিল। আব সে কী আক্রমণ! একটা নমুনা শুনবে? রাত দুপুরে কাঁদে আর বলে আমার এই অবস্থায় তুমি আমার দিকে তাকাবে না? দু ছেলের মা বউ যখন পেটের ভারে এলিয়ে পড়ে ওরকম ভাবে বলে, ব্যাপারটা কী রকম দাঁড়ায় অনুমান করতে পার? জানি না কী করে শক্ত আছি, খাড়া আছি। পশুপতি মৃদুস্বরে বলে যায়, আপিসের লড়াই সহজ। এতগুলি লোক একসঙ্গে আছি, এক চিন্তা, এক উদ্দেশ্য। জানি গুঁতো খেলে সবাই ভাগাভাগি করে খাব। শালা, ঘরের লড়াইয়ে প্রাণটা যায় যায় হয়েছে। ভাবলাম বটে যে আমায় কাবু করতে ওরা উপোস কবে শুয়ে আছে, আমি কেন উপোস করে মরি? তাই হোটেল খেতে এলাম। কিন্তু গলা দিয়ে ভাত কি গলে? চেয়ে দেখি, পশুপতির ক্লিষ্ট মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে, আপনা থেকে সিধে হয়ে গেছে তার বাঁকা মেরুদণ্ডটা। মধ্যস্থ হয়ে আমি একটি প্রস্তাব করি, প্রস্তাবটি গৃহীত হয়। পশুপতির পরিবারটি বোধ হয় এই প্রথম ঘর থাকতে বাইরের এই নোংরা হোটেলে আসন পেতে ভাত খেতে বসে। আচমকা বলে, তা তোমার মনের ইচ্ছাটা জোর করে বললেই পারতে! তোমার বিচার বিবেচনার উপর আমরা কি কথাই কইতে যাব? এই যে তুমি এখানে! —পশুপতির স্ত্রী যেন কত জন্মের আটকানো দম ছাড়ে—মাগো মা, না বলে এমন করে চলে আসে? তারপর পশুপতির বাবা ভেতরে আসে। গভীর স্নেহাতুর চোখে খানিকক্ষণ চুপচাপ চেয়েই থাকে ছেলের দিকে। বলতে বলতে মুখ তুলে সে চোখ বড়ো বড়ো করে চেয়ে থাকে। পশুপতির স্ত্রী সাধারণভাবে একখানা শাড়ি পরে একেবারে হোটেলের খাবার ঘরের ভেতরে এসে দাঁড়িয়েছে। দরজার কাছে বাইরে তার বাবা মা আর কিশোরী বোনটিকেও দেখা যায়। পিসিমা বোধ হয় আসেনি। বড়ো দিদিটিও নয়। তোমার ওই দিদিটি এখনও আছেন? আছে। ভাইয়ের চাকরির মায়া কাটিয়ে যেতে পারছে না। শ্রদ্ধার দৃষ্টিতে তার দিকে চেয়ে নীরবে সায় দিই।
ভিতরে আরও একখানা করে ছোটো ঘর তারা পেয়েছে—কিন্তু রান্নাঘব মোটে একটি। কল্যাণীরা রান্নাঘরের ভেতরে রাঁধে, বিভা রাঁধে বারান্দায়। তবে সুবিধা অসুবিধার হিসাব ধরলে লাভটা কাদের হয়েছে ঠিক করা অসম্ভব। রান্নাঘরখানা ঘুপচি, আলোবাতাস খেলে না, উনান ধরলে একেবারে হাড়কাঁপানো দিনগুলি ছাড়া শীতকালেও ভাপসা গরমে বেশ কষ্ট হয়। নিশ্বাস আটকে আসে, মাঝে মাঝে ছুটে বেড়িয়ে উঠানে দাঁড়িয়ে আকাশের ফালিটুকুর দিকে মুখ তুলে হাঁপ ছাড়তে হয়। বাবান্দায় আবার জায়গা এই এতটুকু, নড়াচড়া করতেও অসুবিধা হয়। সাধারণত কল্যাণীরাই সদরের কড়া নাড়ায় বেশি সাড়া দেয়—তাড়াতাড়ি বেশ একটু আগ্রহের সঙ্গে দেয়। বিভাদের বা উপবতলার ভাড়াটেদের কাছে লোকজন কদাচিৎ আসে, কল্যাণীরা নিজেবাও সংখ্যায় অনেক বেশি, দেখা করতে বেড়াতে বা কাজে বাইবের লোকও ওদের কাছেই বেশি আসে। অন্য ভাড়াটেদেব তুলনায় বাইরের জগতের সঙ্গে ওদের যোগাযোগ অনেক বেশি। ক� �্যাণীরা সম্ভবত রান্নাঘরে খেতে বসেছে বা অন্য কাজে ব্যস্ত আছে, বিভার রান্না খাওয়ার পাট অনেক আগেই চুকে যায়। দু-এক মিনিট দেখে ওদের কাছেই লোক এসেছে ধরে নিয়েও শোয়া বিণাকে তুলে সে খবর নিতে পাঠিয়ে দেয়। এটুকু করতে হয় এক বাড়িতে থাকলে। তাকে দেখেই বিভা ধড়মড় করে উঠে বসেছিল, ব্যাকুল ও উৎসুক কণ্ঠে সে বলে, রানী! ইস, কী রোগা হয়ে গেছিস? কী চেহারা হয়েছে তোর? রানী যেন বেশ একটু ভড়কে যায়, মুখের হাসি খানিকটা মিলিয়ে আসে। —তা যদি বলিস, তুইও তো কম রোগা হসনি। কালো হয়ে গেছিস যে, তোর অমন রং ছিল? দুই সখী ব্যাকুল ও প্রায় খানিকটা ভীতভাবে পরস্পরের সর্বাঙ্গে চোখ বুলিয়ে দেখতে থাকে। দুজনেরই ভাঙাচোরা অতীতের প্রতিবিম্ব নিয়ে যেন দুটি আয়নার মতো তারা পরস্পরের সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। এমন খারাপ হয়ে গেছে চেহারা, এত ময়লা হয়েছে রঙ, এমন ক্লিষ্ট হয়েছে চোখ? এতখানি উপে গেছে স্বাস্থ্যের জ্যোতি, রূপ-লাবণ্য? প্রতিদিন আয়নার সামনে তারা চুল বাঁধে, মুখে পাউডার সিঁথিতে সিঁদুর দেয়, নিজেকে রোগা মনে হয়, কখনও একটু আপশোশ জাগে। কিন্তু আজ বন্ধুর চেহারা চেয়ে দেখার আগে পর্যন্ত তারা ধরতেও পারেনি ক বছরে কী শোচনীয় পরিবর্তন ঘটে গেছে নিজের দেহেও, কী ভাবে শুকিয়ে সিটকে গেছে। ক্ষীণ অস্পষ্ট আশা কি জাগে বিভার মনে যে আজ হয়তো তার কাছেই কেউ এসেছে?
কেউ তো এক বকম আসেই না, যদিই বা কেউ আজ এসে থাকেএকটু পরেই ফ্রক পরা তিন বছরের একটি মেয়ের হাত ধরে বিভাব সমবয়সি একটি মেয়ে খোলা দরজার সামনে এসে দাঁড়ায়। সখীআয় রানী, বোস। কটি হল? সদরের কড়া নড়তে এক মুহূর্ত অপেক্ষা করে বিভা বলে, দ্যাখ তো রিণা কে, কাদের চায়। ভাবতে পেরেছিলি? কেমন চমকে দিয়েছি। বিভা স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে। সে ভুলে গিয়েছিল কী ভয়ংকর দুর্দিনের মধ্যে কী প্রাণান্তক কষ্টে তারা বেঁচে আছে, ভুলে গিয়েছিল কী অবস্থায় কী খেয়ে কত দুশ্চিন্তা আব আতঙ্ক বুকে নিয়ে তারা দিন কাটায়। ছেলেবেলা থেকে শুনে শুনে আর অস্পষ্ট অনুভব করে করে মনের মধ্যে যে বহস্যময ভীতিকর একটা চোরাবালির স্তর গড়ে উঠেছে, যার অতল বিষাদ আব হতাশায় মিছে মায়ার মতো দুদিনের অর্থহীন লীলাখেলার মতো জীবন যৌবন তলিয়ে যায়, সেটা আজ আলোড়িত হয়ে উঠেছিল। এই তবে জীবনের রীতিনীতি মানুষের বাঁধাধরা অদৃষ্ট যে এত তাড়াতাড়ি তাবুণ্য আনন্দ উৎসাহ সব শেষ হয়ে যায়? জীবনের এই চিরন্তন নিয়মেই সে আব বিভা জীবনটা শুধু করতে না করতে মাত্র পঁচিশ-ছাব্বিশ বছর বয়সে এমন হয়ে গেছে? বানী তাকে মনে পড়িয়ে দিয়েছে, না, তা নয়! জীবন অত ফাঁকিবাজ নয়, অমন ভঙ্গুর নয় দেহ। শুধু খেতে পরতে না পেয়ে, চিন্তায় ভাবনায় জর্জরিত হয়ে, হাসিখুশি আমোদ আহ্লাদের অভাবে তাদের এই দশা। কতকাল কেটেছে, ক বছর? এই তো সেদিন তাদের বিয়ে হল, যুদ্ধ বাধার পর একে একে দুজনেরই। বছর পাঁচেক কেটেছে তাদের শেষ দেখা হবার পর। পাঁচ বছরে একটি মেয়ে হয়ে রানীর সেই আঁটো ছিপছিপে গড়ন, যা দেখে তার প্রতিদিন হিংসা হত, সে গড়ন ভেঙে এমন চাঁচাছোলা প্যাকাটির মতো বেঢপ হয়ে গেছে? কণ্ঠার হাড় উঁকি মারছে, চিবুকের ডৌল বুঝি আর খুঁজলেও মেলে না। অমন মিষ্টি কোমল ফরসা রঙ জলে ধোয়া কাটা মাছের মতো কটকটে সাদা হয়ে গেছে। বিভা ভাবে আর উতলা হয়, তাব চোখে জল আসে। বিভার দুটি ছেলেই ঘুমোচ্ছিল, ছোটোটির দিকে কয়েক মুহূর্ত চেয়ে থাকা রানী মৃদুস্বরে বলে, ওর কত বয়স হল? অসহায়ভাবে বিভা পরনের কাপড়খানার দিকে তাকায়। রানী একখানা ভালো কাপড় পরে এসেছে, আগেকার দিনের সঞ্চিত তোরঙ্গে তোলা কাপড়ের একখানা, বিয়ে বাড়ির মতো বিশেষ উপলক্ষ ছাড়া কেউ যা পরে না, পরলে মানায়ও না। এ রহস্যের মানে বিভা জানে, তারও একই অবস্থা।
আত্মীয়বন্ধুর বাড়ি যেতে, সিনেমা দেখতে বেড়াতে বার হতে সাধারণ রকম ভালো কাপড় যা মানায় তাব তোরঙ্গেও আগেকার পাঁচ-সাতখানা ছিল, বাড়িতে পরে পরে সে ভান্ডার শেষ হয়েছে। এ দুঃশাসনের দেশে দ্রৌপদীদের কাপড় টানাটানির শেষ নেই। বিয়ের সময়ের দামি শাড়ি, র ঘরে পরার শাড়ির মাঝামাঝি কিছু নেই, রাখা অসম্ভব। ঘরেও তো উলঙ্গ হয়ে থাকতে পারে না মেয়েমানুষ? ইতিমধ্যে মরিয়া হয়ে চোখ কান বুজে সাধারণ সামাজিকতা রাখার জন্য সাধারণ রকম ভালো দু-একখানা কাপড় সে কিনেছে, প্রাণপণে চেষ্টা করেছে এই প্রয়োজন ছাড়া ব্যবহার না করার কিন্তু সম্ভব হয়নি। চব্বিশ ঘণ্টা দেহ ঢাকতে হয়, বাসিদুটি ছেলেই রোগা, ছোটোটির পেট বড়ো, হাত পা কাঠির মতো সরু। ওটিকে দেখতে দেখতে রানী নিজের চেহারার কথা ভুলে গিয়েছিল। আচমকা সে বলে, কী আর করা যাবে, বেঁচেবর্তে যে আছে তাই ঢের। যা দিনকাল পড়েছে। একা কেন? ঘোড়ায় চেপেই এসেছি, দরজায় দাঁড়িয়ে আছেকী আশ্চর্য্য! তুই কী বল তো? এতক্ষণ বলতে নেই? সত্যি! শেষ করে দেবে। বিভা রানীর মেয়ের হাত ধরে কোলে টেনে নেয়। কটি আবার? এই একটি। তোর? দু বছর। কল্যাণী অমিয়কে জিজ্ঞাসা করছিল, কাকে চান? কল্যাণী বিভার চেয়ে দশ বছরের বড়ো হবে, তার বেশি নয়। তার দুটি ছেলে মেয়ে, সংসারে এগারোজন লোক। সেই চাপে তার লজ্জা শরম মুষড়ে গেছে। আঁচিয়ে উঠে সদরে মানুষ দেখে এক কাপড়ে সে অনায়াসে তার প্রয়োজন জানতে এসেছে, তার সংকোচ নেই দ্বিধা নেই অস্বস্তি নেই। দাসীর মতো দেখায় না রানীর মতো দেখায়, বাইরের অজানা লোকের চোখে কেমন লজ্জাকর ঠেকে এ চিন্তার অঙ্কুরও বুঝি আর গজায় না তার মনে, এমন শক্ত অনুর্বর হয়ে গেছে তাব মধ্যবিত্তের অভিমান। কিন্তু কী ভয়ানক কথা, নিজেও বিভা যে এগিয়ে এসেছে ব্লাউজ না গায়ে দিয়েই! এটা তারও খেয়াল হয়নি। তাড়াতাড়ি ছিঁড়ে যায় বলে দশটা নাগাদ বাড়ির পুরুষরা আপিসে কাজে বেরিয়ে গেলেই সে ব্লাউজ খুলে ফেলে, বিকালে পুরুষদের ফেরার আগে একেবারে গা ধুয়ে আবার গায়ে দেয়। খালি গায়ে থাকাটা কি তাবও অভ্যাস হয়ে গেল কল্যাণীর মতোই? দাসী চাকরানি মজুরনির মতোই? কান দুটি গরম হয়ে ওঠে বিভার। কাপড় ছাড়তে হয়, স্নান করে ধুতে হয় সাবান কেচে ধোপে দিয়ে ধোয়াতে হয়—নিত্যকার এই চলতি প্রয়োজনের দাবি সবচেয়ে কঠোর।
তাই ভাবতে হয়েছে, এখনকার মতো পরে ক-টা দিন চালিয়ে দিই, উপায় কী, ধোপ দিয়ে এনে তুলে রাখব। তুলে রেখেছে কিন্তু বেশি দিন তুলে রাখা যায়নি। দশ মিনিটের বেশি অমিয় বসে না। কাজে যাবার পথে সে রানীকে শুধু পৌঁছে দিতে এসেছে। বেচারির গুলিও লেগেছে, সরকারি দপ্তরের চাকরিটিও গেছে। বন্ধুরা একটি কাগজে মোটামুটি একটা কাজ জুটিয়ে দিয়েছে। ঘটনাচক্রে কাগজটি আবার সরকার-বিরোধী, কাগজটাই কবে বন্ধ হয়ে যায় ঠিক নেই। আলনার শাড়ি দুখানার একটি পরনের খানার মতোই ছেঁড়া অন্যটি বড়ো বেশি ময়লা। বাক্সো কি খোলা যায়? রানীর স্বামী সদর দরজায় দাঁড়িয়ে আছে, এখন কি অত সমারোহ করা চলে? হাত বাড়িয়ে সে ময়লা কাপড়খানাই টেনে নেয়। কল্যাণী বোধ হয় কথাটা বিশ্বাস করে না, অমিয়র চেহারায় সেরে ওঠার লক্ষণ খুঁজে পাওয়া সত্যই কঠিন। কোনো রোগ সেরে গেলে এ রকম চেহারা হয় না মানুষের, বোগ বজায় থাকলেই হয়। কালিপড়া চোখে শুধু তার দৃষ্টিটা উজ্জ্বল ঝকঝকে। আমাদের এখানে এসেছেন, সে কল্যাণীকে বলে, সেই যে রানীর কথা বলেছি আপনাকে, আমার ছেলেবেলায় বন্ধু? তার স্বামী। কী জানেন, সব উনিশ আর বিশ, সে বিভাকে বলে, ও ছাতার চাকরি থেকেই বা কী এমন স্বর্গলাভ হচ্ছিল? ঘরে বাইরে চাকরির মর্যাদা রাখতে প্রাণ যায় যায় অবস্থা। নিজের মনটাও মানে না, যেমন হোক চাকরি তো করি, মাস গেলে মাইনে তো পাই যা হোক, একদম মিনিমাম ভদ্রলোকের স্ট্যান্ডার্ড তো অন্তত রাখতে হবে? সে এক ছুঁচো গেলার অবস্থা, পেটও ভরতে পারি না, না খেয়ে মরতেও পারি না। এখন শালা বেশ আছি, হয় এসপার নয় ওসপার; ব্যসআপনার অসুখ নাকি? কল্যাণী বিনা ভূমিকায় প্রশ্ন করে। অসুখে পড়েছিলাম, এখন সেরে উঠেছি। এত বড়ো কথাটা ভুলে যাবার জন্য কল্যাণী অপরাধীর মতো হাসে। ওঃ, মনে পড়েছে, কল্যাণী আচমকা বলে, আপনারই গুলি লেগেছিল। অসুখও হয়েছিল। আমিয় বলে। কাগজে পড়ে বিভা বলেছিল আপনার কথা। কিন্তু অমিয়কে বিশেষ শঙ্কিত মনে হল না। বরং কেমন একটা বেপরোয়া ভাব এসেছে। ছোটোবকুলপুরের যাত্রী
হয়তো অনেক কিছু অন্য রকম দেখে তার ভালো লাগছে না--হয়তো সে ভুল বুঝছে তাব কথা ও ব্যবহার, আরও হয়তো ভুল বুঝবে! এই একখানা আব পাশের আধখানা নিয়ে দেড়খানা ঘরে কত দিকে যে বিষিয়ে গেছে জীবনটা সে নিজেই কি খানিক খানিক জানে না। রানী এসে দাঁড়ানো মাত্র তার ফ্যাকাশে ম্লান চেহারা দেখে উতলা হওয়ার সঙ্গে প্রাণটা তার ধক করে উঠেছিল বিপদের আশঙ্কায়! তার সখী এসেছে, এককালে দিনে অন্তত একবার যাকে কাছে না পেলে সে অস্থির হয়ে পড়ত এতদিন পরে সেই সখী এসেছে তার ঘরের দরজায়—আনন্দে উচ্ছ্বসিত হয়ে ওকে তো সে অভ্যর্থনা করতে পারবে না, হেসে কেঁদে অনর্গল আবোল-তাবোল কথা যা মনে আসে বলে গিয়ে প্রমাণ দিতে পারবে না সে কৃতার্থ হয়েছে! সে সাধ্য তার নেই, হাজার চেষ্টা করেও বেশিক্ষণ সে আনন্দোচ্ছ্বাস বজায় রাখতে পারবে না, ঝিমিয়ে মিইয়ে তাকে যেতেই হবে। কী ভাববে তখন রানী? কী বিশ্রী অবস্থা সৃষ্টি হবে? অনায়াসে বিনা দ্বিধা সংকোচে সে বিভার সামনে শালা শব্দটা উচ্চারণ করে। সত্যই করে। কী ছোটোলোক হয়ে গেছে শিক্ষিত মার্জিত ভদ্র সন্তান! পাশে কোথায় রেডিয়োতে মিষ্টি অলস সুরে গান বাজছে, উঠানে এঁটো বাসনের ঝনঝনানি। কল্যাণীদের বাসনের সঙ্গে দোতলার এঁটো বাসনও উঠোনে এসে জড়ো হচ্ছে। একসঙ্গে ছোটো ছেলেমেয়ে কাঁদছে তিনটে অথবা চারটে, সংখ্যাটা ঠিক ধরা যায় না। কিন্তু যেতে পারেননি। —কোটরে বসা চোখের উজ্জ্বল দৃষ্টিতে সোজা বিভার মুখের দিকে তাকিয়ে দশ মিনিটে গড়া আশ্চর্য অন্তরঙ্গতায় মুখের কথা কেড়ে নিয়ে অমিয় সহজ সহানুভূতির সায় জানিয়ে বলে, আপিস, ছেলে পড়ানো, বাজার, রেশন কয়লা ওষুধ ডাক্তার--কী করেই বা পারবেন? আরও ভেবেছিল: বিকাল পর্যন্ত যদি থাকে, চায়েব সঙ্গে ওকে কী খেতে দেব? ওর মেয়ে যদি দুধ খায়, দুধ কোথায় পাব? শ্রান্তিতে যদি ওর হাই ওঠে, বিছানায় কী পেতে দিয়ে ওকে আমি শুতে দেব। বলেনি? চিঠিটা পড়ে কেবলি বলত, দেখলে? ছেলেবেলার বন্ধু, কত ভাব ছিল, কাগজে গুলি লাগার খবর পড়ে একটা চিঠি লিখে দায় সেরেছে। কর্তাটিকে পাঠিয়েও তো খবর নিতে পারত? ওঃ, এই ঝগড়া! —বিভা সত্যই বিব্রত বোধ করে, —যাব মনে করেছিলাম। ওঁকে তাগিদ দিয়েছি, এক মাসের ওপর যাব যাব করছেন—দশ মিনিটের মধ্যে অমিয় তাদের সখীত্বকে সহজ করে বাস্তবের দৃঢ়ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত করে দিয়ে গেছে। বিভার আর কোনো ভয় নেই, ভাবনা নেই সংকোচও নেই।
কারণ, কোনো অভাবউঠে দাঁড়িয়ে অমিয় বলে, আপনার চিঠি পাবার পর থেকে বাড়ি বয়ে এসে ঝগড়া করার জন্য কোমর এঁটে বসেছিল, আমার অসুখের জন্য দেরি হয়ে গেল। অমিয় চলে গেলে বিভা সহজভাবে বলে, নে কাপড়টা ছেড়ে হাত পা এলিয়ে বোস, সং সেজে থাকতে হবে না। এখনো ছুঁচো গেলার অবস্থা। —বিভা প্রাণ খুলে হাসে। কীসের ঝগড়া? ৩০০ মানিক রচনাসমগ্রচাবগাছা চুড়ি, সব হাবটা আব কানপাশা। সে বছব টাইফয়েডের এক পালা গেল, তারপর আমার কপাল টানল হাসপাতালে। মরবে জেনেও কেন যে পেটে আসে বুঝি না ভাই। আমাকেও প্রায় মেরেছিল, কী যে কষ্ট পেলাম এবার। অথচ দ্যাখ, এ দুটোব বেলা ভালো করে টেবও পাইনি। দিন কাল খারাপ পড়লে কি মানুষের বিয়োনের কষ্টও বাড়ে? আগেও ঠিক এমনি ভাবেই জীবনের গহন গভীর গোপন রহস্যের কথা উঠত, কেউ একজন মুখ খোলার আগে চোখ মুখের ভাবভঙ্গি দেখেই দুজনে টেব পেত যে জগতের সমস্ত মানুষের কাছ থেকে আড়াল করা শুধু তাদের দুই সখীর প্রাণে কথাবলি হবে। কোনো অব্যবস্থাব জন্য বানী তাকে দায়ি করবে না, তার মেয়ে দুধের খি� �েয় কাঁদলে সে যদি শুকনো দুটি মুডি শুধু তাকে খেতে দেয়, তাতেও নয়। চাদরের বদলে ময়লা ন্যাকড়া পেতে দিলেও গা এলিয়ে বানী তাকে গাল দেবে না মনে মনে। বানী একটু হাসে, উঠে এসে বললি তো একা শুতে ভয় করছ? তোবও তবে ওই রকম? —বিভা যেন খসি পায়। বানী বলে, বল না? তুই আগে বল। দুই সখী আশ্চর্য্য হয়ে পরস্পরের মুখের দিকে চেয়ে থাকে। একটা পান দে না বিভা? এটুকু অমিয় তাকে বুঝিয়ে দিয়ে গেছে। ময়লা শাড়িখানা পরে বানীও যেন বাঁচে। কী তবে? তোর এক রকম আমার অন্য রকম? বিভা বলে, কিছু বুঝতে পাবি না ভাই। এ বকম যাচ্ছেতাই শবীব, কী যে খাবাপ লাগে বলাব নয, তবু আমাব যেন বেশি কবে ভূত চেপেছে। বিয়ের পব দু-একবছর সবাবই পাগলামি আসে, ও বাবা এখন যা দাঁড়িয়েছে তাতে তখন রীতিমতো সংযমী ছিলাম বলা চলে। আগে ভাবতাম ও বেচাবিব দোষ, ঝগডা কবে ও ঘবের ঘুপটিব মধ্যে বিছানা কবে শোযাব ব্যবস্থা করেছিলাম। তখন টেব পেলাম কী বিপদ, আমারও দেখি মবণ নেই। ঘুম আসবে ছাই, উঠে এসে যদি ডাকে ভেবে কী ছটফটানি আমার। বিশ্বাস করবি? থাকতে না পেবে শেষে নিজেই এলাম। টুকটাক আছে। তোব? বানী বলে, তবে আমার আজকাল কেটে গেছে, অনাদিকে মন দিতে হয়। তোরও কেটে যাবে। একটু ভেবে বানী আবাব বলে, আমার মনে হয় এ একটা ব্যাবাম। ভালো খেতে না পেলে ভাবনায় চিন্তায় কাহিল হলে এ বকম হয়।
ছেলেপিলেকে দেখিস না পেটেব ব্যাবাম হলে বেশি খাই খাই কবে, চুরি করে যা তা খায়? কোথা পাব পান? ত্যাগ করেছি। মাসে তিন চারটাকা খরচ—কী হয় পান খেয়ে? একটি লবঙ্গ মুখে দিয়ে মুখশুদ্ধি হয়। নে। বিভার বাড়ানো হাতে প্লাসটিকের চুড়ি নজব করে বানী হাসে। দুই সখী অদ্ভুত এক জিজ্ঞাসার ভঙ্গিতে চোখে চোখে তাকায়, দুজনের মনে এক সঙ্গে একই অভিজ্ঞতা একই সমস্যা জেগেছে, আজ দুজনের নিবিবিলি দুপুরে কাছাকাছি আসাব সুযোগে পরস্পরের কাছে প্রশ্নটা তাদের যাচাই করে নিতেই হবে। জানতে হবে, খাপছাড়া অদ্ভুত একটা ফাদে পড়াব যে বহসাময় ব্যাপারটা নিয়ে যন্ত্রণার অন্ত নেই, সেটা শুধু একজনের বেলাই ঘটেছে না দুজনেরই সমান অবস্থা। বুঝতে হবে কেন এমন হয়, এমন অঘটনের মানে কী? ফ্যাশন কি এমনি চালু হয়? যেমন অবস্থা তেমন ফ্যাশন। সোনা নেই তোর? বাড়ে না, খেতে পারে না, মনে শান্তি থাকবে না, গায়ে পুষ্টি হবে না, বিয়োলেই হল? তুইও ধরেছিস? ভাগ্যে এ ফ্যাশনটা চালু হয়েছে--সোনা না দেখে লোকে কিছু ভাবে না। ছোটোবকুলপুরের যাত্রী ৩০১সেই এক মুহূর্তের হাসির ক্ষীণ শব্দ সঙ্গে সঙ্গে কোথায় মিলিয়ে যায় শিশুর কান্না বাসন নাড়ার শব্দ মেশানো দুপুরের স্তব্ধতায়। শুধু শিশুর কান্না নয়, এ বাড়ির দোতলাতেই মেয়েলি গলায় একজন সুর করে কাঁদছে। উপবতলায় একজন ভাড়াটে রমেশ, তার বুড়ি মা। রমেশের ছোটো ভাই অশেষ, সবে কলেজ থেকে বেরিয়ে চাকরির ধান্ধায় ঘুরতে শুরু করেছিল, কদিন আগে টিবি রোগে সে মারা গেছে। এই সেদিন দেখেছি চলাফেরা করছে, বিভা হঠাৎ শিউরে উঠে বলে, দিনরাত ঘুবে বেড়াত। ওঁর সঙ্গে তর্ক করত আমরা স্বাধীনতা পেয়েছি কি না। এই বিছানায় বসে একদিন রাত্রে কথা কইতে কইতে কাশতে শুরু করল, এক ঝলক রক্ত উঠে চাদরে পড়ল। কী বকম ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে যে চেয়ে রইল ছেলেটা। আগে একটু আধটু রক্ত পড়েছে গ্রাহ্যও করেনি, সেদিন প্রথম বেশি পড়ল। নিজের শরীরটাকে পর্যন্ত গ্রাহ্য করে না, কী যে হয়েছে আজকালকার ছেলেরাকী ভাবি জানিস রানী? শুধু শাকপাতা আব পচা চালের দু মুঠো ভাত খায়, না এক ফোঁটা দুধ না এক ফোঁটা মাছ। এই খেয়ে আপিস করা, রাত নটা পর্যন্ত ছেলে পড়ানো। একদিন যদি ওই রকম কথা কইতে কইতে ও কাশতে শুরু করে আর-আনমনে কী যেন ভাবে, একটু ম্লান হেসে বলে, প্রথমে ঠিক হয়েছিল চাদরটা পুড়িয়ে ফেলব। কিন্তু তাহলে সঙ্গে সঙ্গে আবার একটা চাদর কিনতে হয়।
শেষ পর্যন্ত তাই—রানী অসম্ভবকে সম্ভব করে যোগ দেয়, —রক্তে বিছানা যদি লাল হয়ে যায়? আমিও আগে এ রকম আবোল-তাবোল কত কী ভাবতাম। রক্তে একদিন রাস্তাই লাল হয়ে গেল। আর ভাবি না। কী আছে অত ভয় পাবার, ভায়না করাব? সংসারে কুলিমজুরও তো বেঁচে আছে, বেঁচে থাকবে। এ কথাটাও বিভা শেষ পর্য্যন্ত বলে উঠতে পারে না, আবার আনমনা হয়ে যায়। এ কথারও শেষটা মুখে উচ্চারণ করা অসম্ভব। চুরি করেও খাস না কি তুই? দুই সখী হেসে ওঠে।
৩০২ মানিক রচনাসমগ্রচালাব কোনাব দিকের মোটা ধাবাটা সুখলালের ঘরের জানালার হাত দেডেক তফাতে নামে, বৃষ্টি যখন জোবে হয। সুখলাল ওখানে দুখানা ইট বসিয়ে দিয়েছে, নইলে জলের তোড়ে মাটিতে গর্ত হয়ে যাবে। টিপ টিপি বর্ষার ধারাটা এখন খুব সবু, ইট ঘেঁষা কটকটে ব্যাঙটা তারই ছিটকানো জলের ছাটে বিরক্ত হচ্ছে। বুড়ো আন্দুলের বড়ো মোরগটা আবর্জনার স্তূপে নির্বাহ নিস্পৃহের মতো ঠোকর মারছিল, আচমকা সে মাথা উঁচু করে উদ্ধত বীরের মতো দাঁড়ায়, ফুলে ফেঁপে ওঠে পালক, মুরগি ক টা সচবিত হয়ে ওঠে। গোববাব মা ক্রুদ্ধ চোখে তাকায়। লক্ষ্মী টাকা বেখে যাক বা না যাক, সুখলাল কিছু জানুক বা না জানুক, আসল কথাটা এই যে টাকা ধাব দেওয়া হবে না। অন্য অবস্থায় লক্ষ্মী টাকা বেখে না গেলেও সুখলাল নিজেই দিত, কিন্তু অবস্থা এখন অন্যবকম। এক মাসের ওপব গোববা ধর্মঘট কবে সবে আছে। মোবগটার দাম চার টাকা। সুখলাল মুরগি খায় না, মাছ মাংস ছোঁয় না। রাম রাম, ভাবাও যায় না ও সব খাওয়ার কথা। তার বাবুর জন্য মোবগটা সে দর করে রেখেছে। শকুন্তলা ওয়ার্কসের ইঞ্জিনিয়ার বীবেনবাবু তার বাবু। বাড়ি বেশি দূরে নয়, ও বেলা পৌঁছে দিয়ে আসতে হবে। শনিবার বাইরে মদ বন্ধ, বীবেনবাবু সেদিন বাড়িতেই খায়। তার বউ মুরগির মাংস বাঁধবে। চার টাকা দাম মোবগটার। গা জ্বালা করে সুখলালের। শালা মুরগিখোর। গোববাব মা ভেংচে বলে, আমি কুছু জানি না! জানো না তো অত কথা কেন, কীসেব বুপেযা। কী জন্য বুপেযা—তোমার মুন্ডুব জন্য বুপেযা। দু মিনিটের মধ্যে সে ঘর থেকে কাঁসাব ছোটো গ্লাসটা নিয়ে ফিবে আসে। বলে, নাও, এবাব বাব করো টাকা। পেটে লাগবে বুপেয়া, খেতে লাগবে। দু হাতে গোববাব মা চামডা কুঁচকানো সবু পেটটা থাবডে দেয়—ধাব দেবে বলেছিল। গোবিন্দ মা বলে, একটা বৃষভ্যা দেবে বলছিল। সুখলাল জিজ্ঞাসা করে, কীসের বৃথা? গোবর্দ্ধন মা এসে শুয়েছিল, হাঁ সুখলাল লক্ষ্মী রূপেয়া রেখে যায়নি?
টিপি টিপি বৃষ্টিতে বস্তিব হাঁটাপথের পাঁক কালো ক্ষীর হয়ে আছে। কী কী মেশাল আছে তালিকা বানানো শক্ত। লাগাও জমিটাতে বহুকাল গন্ডা তিনেক মহিষের বসবাস, এখান থেকেই উপকরণ এসেছে বেশির ভাগ। মাঝে মাঝে পিলু ধাঙব বদ্ধ নালাটাব নানারকম আবর্জনার জমাট বাঁধা মিতালি কোদালে টেনে তুলে নালার পাশেই জমা করে যায়, তাও যথেষ্ট পরিমাণে আছে। মানুষের দৈনিক স্বভাবগত ত্যাগও খানিক বয়ে গড়িয়ে পথে এসে যায়, কী করা যাবে কোনো প্রতিকার নেই। মরা ইঁদুর, বেডালছানা, পাখি, ব্যাঙ, ইত্যাদি পচে গলে মিশে যায়। আরও অনেক কিছুর সমন্বয় ঘটে। নিচু আকাশে ঘন কালো মেঘ থেকে যে নির্মল ধারা নামে টিন ও খোলাব চাল বেয়ে গড়িয়েও কী জন্য বলেছিল? কীসে লাগবে বৃথা? আমি কিছু জানি না। নিচু চোখে দু আনা আর দু পয়সাছলছলে পরিষ্কার থাকে, কী বিষাক্ত নোংরা হয়ে যায় এখানকার পৃথিবীতে পড়ায়। গোবরার বউ দুর্গাকে সিঁদুরের গল্পটা সে শোনায় রেশন নিয়ে এসে। ইতিমধ্যেই হৃদয় পুড়ে যাওয়া জ্বালার সেই পুরাণ ইতিহাস কথকতার ছোঁয়াচ লাগা উদ্দীপনার মুহূর্তে ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে সে যা বলেছিল আর সুখলাল যে জবাব দিয়েছিল তা অনেকখানি ধাঁধার মতো হয়ে গেছে। লক্ষ্মীর নামে যে অকথা কুকথা কানাঘুষা শোনা যায় তাই নিয়ে সে কি গাল দিয়েছিল সুখলালকে? সুখলাল কী জবাব দিয়েছিল যে তার ছেলের বউ দুর্গাও বজ্জাতিতে কম যায় না? কে জানে। ও রকম ঘষেমেজে সাবধানে শাপ দিতে গেলে না হয় জিভের সুখ, না হয় প্রাণের শান্তি। যা মুখে আসে বলে দিলে হয়তো সুখলাল চটে লাল হয়ে যেত, এ বস্তিতে বাস উঠত তাদের। তবু বোঝা তো যেত সঠিকভাবে যে একজনকে প্রাণ ভরে গাল দিলাম আর সে প্রাণভরে প্রতিশোধ নিলে জ্বালা পেটের জ্বালার চেয়ে বেশি, কারণ পেটে জ্বালাতেই এর জন্ম। ময়লা ন্যাতানো এক টাকার নোটটা হাতে পেয়েই গোবরার মা তাই একটা শাপ ঝেড়ে দেয়, সুখলালের একটা টাকাও অন্তত সুদে ধার দেবার ক্ষমতা থাকায় তাকে ভয় করে বলে শাপটা সোজাসুজি গাল হয়ে বেরোয় না তার মুখ থেকে। শিল্পী কবির কায়দা খাটিয়ে ঝাঁঝালো হাসি হেসে বলে, সিঁথেয় অত যে সিঁদুর সাঁটে তোমার লক্ষ্মী, তেলে জবজবিয়ে, ওতে উকুন লাগবে, পোকা ধরবে সুখলাল। এত তোমার টাকার খাঁকতি, টাকার পোকা নোংরা করবে সিন্দুরসে বলে, একবার গেছলাম, ফের যেতাম। তোমায় এত কাণ্ড করতে কে বলেছে? ছেলে তোমায় কালীঘাটের ধর্মের ঘট ফেলে ধর্মঘটের ঘট মেনেছে।
তা বাবা যা করেছে, সে আর দশটা মদ্দপুরুষের সাথে করেছে। বুড়িঘাগি মেয়েমানুষ তুমি, সব তাতে তোমার মাথা গলানো কেন? দুর্গার এক ফোঁটা কৃতজ্ঞতা নেই! বুড়ি শাউড়ি যে জোগাড়যন্ত্র করে রেশনের চাল আটা এনে আজ শনি আর কাল রবিবারের পেটপূজার ব্যবস্থা করেছেন যেমন করেই হোক, নইলে এ বেলা থেকেই উপোস শুধু হত, এ সব যেন দুর্গার হিসাবে আসে না। কয়েক মিনিট জোর বৃষ্টি হয়ে আবার টিপটিপ বর্ষণ চলে। মোটে একটা মাস, আষাঢ় মাসটা খেটেই যেন মেঘেরা শ্রান্ত হয়ে পড়েছে। ভোরে এমনই এক পশলা জোরালো বর্ষণের মধ্যেই লক্ষ্মী বস্তা মাথায় চাপিয়ে কাজে বেরিয়েছিল। সুখলালের একটা ছাতি আছে কিন্তু মেয়েরা কি ছাতি মাথায়বড়ো তুমি পেট চিনেছ ওনার মা! —দুর্গা বলে আঁচলের গিঁট খুলতে খুলতে, সগ্গে যাবে সে ভাবনা নাই, পেটের ভাবনায় মলে। আমি বলে কত করে মাইনের দু টাকা আগাম নিয়ে ঘরে এলাম যে রেশন আনব, উনি আগে ভাগে সুদে টাকা ধার করেছেন! তর সয় নাসুদের দু আনা অবশ্য দুর্গাই দেয়। মুখে যা বলার তা যত খুশি বলা যেতে পারে কাজে মানিয়ে না চললে হবে কেন? গোবরার মা তো কেবল নিজের পেট নয় তাদের সবার পেটের ভাবনাতেও উতলা হয়েছিল। একটা কার্ডের রেশন আনা বাকি আছে, এ বেলা না আনলেও উপায় নেই। শনিবার বিকালে রেশন দেয় না, রবিবার দোকান বন্ধ। আটা চাল আনাই চাই এ বেলা। একটা অতি আধুনিক ছোটো সাইজের ধাতুব টাকা বাড়িয়ে দিয়ে বলে, টাকা দিয়ে মোর গেলাস নে এসো, যাও। নোংরা কীসের? আসলি চিনা সিন্দুর আছে। তোমার ছেলের বউ ভি ওই সিঁদুর লাগায়। আচ্ছা সিন্দুর। আ মরণ, গোবরার মা ভড়কে গিয়ে বলে, রেশনের চাল আটা না আনলে পর—সে তুমি দেবে। অত তোমার বাড়াবাড়ি কেন? আর দু আনা?
বিশেষ ঘটনা ঘটলে, কাহিনির গাঁটছড়ায় নূতন একটা গাঁট পড়লে, ঢিল-লাগা চাকের মতো চাঞ্চল্য ও জটলার গুঞ্জন দেখা দেবে বইকী। দেয়? দিলে একটা ছাতি নিয়ে টানাটানিতে পুরুষের বড়ো অসুবিধা ঘটে। আগে লক্ষ্মী তিন বাড়িতে ঠিকে হিসাবে ঝিয়ের কাজ করত, বাসন মাজা, ঘর ঝাঁট দেওয়া, জলতোলার কাজ। এখন সে শুধু এক বাড়িতে ভোর থেকে প্রথম রাত্রি পর্যন্ত খাটে, বাসনমাজা জলতোলার কাজ ছাড়াও ছেলে রাখে, দুপুরে ওখানেই খায়, রাত্রের খাবার বাড়ি নিয়ে আসে। সিনেমা জগতের এক মস্ত লোকের বাড়ি, গিন্নির বড়ো বড়ো দুটি এবং একেবারে কচি দুটি বাচ্চা। দুটি জোড়া ছেলেমেয়ের মধ্যে প্রায় বারো বছর-এর তফাত। লক্ষ্মীর কাছে বস্তির সমস্ত মেয়ে পুরুষ এক আশ্চর্য কাহিনী শুনেছে এবং হেসেছে। কীসে এমন হয়, কোন রোগে, তারা জানে। দীর্ঘ যুদ্ধটা তাদের জানিয়ে দিয়ে গেছে। ওই যে মনোহর হেয়ার কাটিং সেলুন চুল ছাঁটে, ওর বউ কাদম্বিনী বছর বছর চার পাঁচটা বিয়ে আচমকা থেমে গেল খট করে-সাত-আট বছর। কোথায় ছিল তার ভগ্নীপতি দাশরথি, যুদ্ধের হট্টগোলের বাজারে এই কাজ ছেড়ে ও কাজ ধরতে ধরতে কোথা থেকে এসে জুটল এখানে, জোর করে ধরে বেঁধে চিকিৎসা করিয়ে দিল দুজনের। তারপর চেয়ে দেখো ম্যাজিক, তিন বছরে ফের আবার দু-নম্বর বাচ্চাটা মাই টানছে কাদম্বিনীর। এত সব ঝঞ্ঝাট ছিল না জগতে, সায়েব রাজা মালিক বড়োলোকেরা তৈরি করেছে। নাচে গায় ফুর্তি করে, মেয়েপুরুষে বাছবিবিচার নেই কে কার সোয়ামি। শুধু তাই হলে তবু পদে ছিল। রক্তের সম্পর্কের বালাই পর্যন্ত নেই ওদের। বাপ মেয়ের হাত ধরে হাওয়া খেতে যায়, গভীর রাতে ভাইবোন ছাতের আলশেয় ঘেঁষাঘেঁষি ঝুঁকে ফিসফাস গুজগাজ করে। ঘরে বাইরে বল আর আগা পরের মধ্যেই বল, ওদের যে কোনো নিয়মনীতি ধর্ম নেই এ তো তারা চিরকাল টের পেয়ে এসেছে। আরও বেশি টের পেয়েছে মাঝে মাঝে সিনেমায় ওদের জীবনযাত্রার মারপ্যাঁচ দেখে-মেয়েবা যা সব দেখে স্তম্ভিত হয়ে যায়, পুরুষেরা শিস দেয়, কী অনায়াসে ওরা নিজেদের সে সব কুৎসিত বেলেল্লাপানা দেখিয়ে দেয়বিপিন বলে, হাঁ, গরম বটে। নয় তো এত জানে এত করে আর নিজেদের স্বভাবটা শুধরাতে পারে না? আপসে কটা নিয়ম করে আপসে মেনে চলতে পারে না? তা, সবাই হল হামবড়া, কে বা কার কথা শোনে, কে বা কাকে মেনে চলে। লক্ষ্মী বা সুখলালের কাছে মাঝে মাঝে অনেকেই ওরকম দুটো একটা টাকা ধার নেয়, ঘটিবাটি বাঁধাও দেয় অবস্থা বিশেষে, আসল এবং সুদ দুইই আদায় করে সুখলাল।
এ বস্তির ক্ষুদ্র এলাকায় কেন, প্রকাণ্ড পৃথিবীটায় সর্বত্র এটা নিত্যকার ঘটনা, মানুষের জীবনযাত্রার একটা সাধারণ মূল নিয়ম। তা করে, ধনদৌলত বিদ্যাবুদ্ধি কিছুর অভাব নেই, বিপদ যেমন টেনে আনে তেমনই তার কাটানও জানে। কিন্তু কেন? এ কোন দেশি ছিনিমিনি খেলা সৃষ্টির সাধাসিধে সহজ নিয়ম নিয়ে? কোন ভূতে ওদের কিলোয় যে মানুষ হয়ে পশুর মতো আচরণ না করে স্বস্তি পায় না? বুড়ো বিনোদ বলে, তা যাই বলো, একধার থেকে পাপ করে যেমন ছিষ্টিচাড়া রোগ ছিষ্টি করে তেমনই আবার চটপট সেরে যাবার চিকিৎসাও বার বার খুঁজে। অনাদি বলে, টাকার গরম, যেমতার গরম। মানিক ৬ষ্ঠ-২০ছোটোবকুলপুরের যাত্রী ৩০৫বিনোদের দীর্ঘ কাল্পনিক উপমার ব্যাখ্যা সকলে মন দিয়ে শোনে, কারণ তাদের ক্ষুব্ধ প্রতিবাদের মর্মকথাটা সত্যই এতে স্পষ্ট হয়ে ওঠে তাদের কাছে। তুচ্ছ দু আনা পয়সাটাই যে আসল নয়, গুরুত্বপূর্ণ নিয়মনীতির যে প্রশ্নটা জড়িয়ে আছে তার সঙ্গে সেটাই বড়ো কথা, মনে মনে পরিষ্কার বুঝলেও ভাষায় সেটা ব্যক্ত করতে তাদের সকলকেই রীতিমতো বেগ পেতে হচ্ছিল। সুখলাল তাদের সহজ ভাষায় কথা কইতে জানে, আসল বক্তব্য কী তাও বেশ বোঝে, কিন্তু এখন সে ওই ঘরোয়া ভাষা বুঝতেই নারাজ হয়েছে, তাই অবশ্য এত মুশকিল। কাটা ছেঁড়া ছাঁকা কথায় একেবারে ওই দু আনা সুদ থেকে নীতিটা ছেঁকে নিয়ে ভিন্ন করে বুঝিয়ে বলার চেষ্টা করতে গেলেই এতক্ষণ তাদের অত্যন্ত যুক্তিসঙ্গত বক্তব্যটা যেন হাওয়া হয়ে যাচ্ছিল। সকলের মেজাজ তাই চড়ছিল, বিনোদ গোবরার মার কাঁসার গেলাসটার স্থানে কাল্পনিক একটা পাঁচ টাকার নোট আমদানি করে মূল কথাটা সুখলালের মাথায় ঢুকিয়ে দিতে পেরেছে ভেবে তারা একটু ঠান্ডা হয়। ময়লা ন্যাতানো একটা এক টাকার নোট দশ-বিশমিনিট পরে চকচকে নতুন একটা ধাতুর টাকা হয়ে ফিরে এলে সুখলাল কেন সেটা গ্রহণ করে গোবরার মার কাঁসার গেলাস ফিরিয়ে দেবে না? একটা আনি একটা ডবল আর দুটো ফুটো তামার পয়সাও কেন সে জোর করে আদায় করবে গোবরার মার কাছ থেকে? একটা দিনরাত্রি দূরে থাক, একটা বেলাও কাটেনি, কয়েক মিনিটের মধ্যে গোবরার মা টাকাটা ফেরত এনেছে। তার জন্যও সুদ? দু আনা সুদ, নগদ? সুদ নেবার অধিকার নিশ্চয় আছে সুখলালের। টাকায় দু আনা সুদ সে নিশ্চয় পাবে যেই টাকা ধাব নিক—বরাবর বিনা প্রতিবাদে সবাই তাকে তার প্রাপ্য সুদ দিয়ে এসেছে।
গোবরার মাও আগে দু বার গোবরার হয়ে তার কাছে টাকা নিয়ে আসলের সঙ্গে পুরো সুদ মিটিয়ে টাকা শোধ দিয়েছে। কিন্তু এবাব সে সুদ দেবে কেন? এতটুকু সময়ের মধ্যে সে যখন টাকা ফিরিয়ে দিয়েছে, তার আবার সুদ কীসের? বিনোদ মিস্ত্রি বলে, সুখলাল, ও হিসাব ছাড়ান দাও। মনে কর পাঁচ টাকার নোট নিয়ে এলাম তোমার কাছে। সুখলাল, ভাঙানি আছে? তুমি বললে, না, ভাঙানি নাই। নোটটা রেখে একটা টাকা নিলাম তোমার কাছে, ফের খানিক পরে তোমার টাকা ফিরিয়ে দিলাম। সুদ নেবে তুমি?
মালতী তিন টাকা ধারে সুখলালের কাছে, মাস পুরতে আর মোটে কটা দিন বাকি। মাস পুরে দুটো দিন গেলেই তার ছ আনা সুদ ন আনা হয়ে যাবে। কীসে তবে সারা বস্তিটা চঞ্চল হল? জগতের সমস্ত অনাচার অত্যাচার অনিয়মের অসংখ্য গুদামখানার যেটা অন্যতম, সেখানে যারা প্রায় উলঙ্গ হয়ে উপোস দিয়ে পর্যন্ত থাকে, সুখলালের ব্যবহারে কী এমন গুরুতর অন্যায়টা তাদের টনক নড়িয়ে দিল? কেন? —এ যুক্তি সুখলাল বুঝতে চায় না, মানতে চায় না, —টাকায় দু আনা দিবে। আজ না দিক, দশ রোজ বাদে দিক, এক মাহিনা তক্ দু আনা। আজ দিতে বলেছি আমি? এটা যুক্তি বইকী, আইনের অকাট্য যুক্তি। মুশকিলও হয়েছে ওইখানেই। উচিত অনুচিত ন্যায় অন্যায় মানবে না সুখলাল, সে শুধু আইন জানেমালতী বলে, মরণ তোমার। আর তুই কথা জানিস নে? ঘুরিয়ে ফিরিয়ে এক কথা একশোবার। পাঁচ রুপেয়ার নোট! —সে বলে, পাঁচ রূপেয়া নোটে এক রূপেয়া নিলে সেটাও হাওলাত আছে কি? পাঁচ রূপেয়া নোট দিয়ে এক রূপেয়া নাও, চার রূপেয়া নাও, পুরা পাঁচ রূপেয়া নাও, আমার তাতে কী আছে? রূপেয়া যদি ধার নিবে, তবে সুদ দিবে, বাস্। সুদের ওই দু আনা পয়সা। কিন্তু সুখলালেরও নিজের সাদাসিধে নীতিবোধ আছে, সে তার গোঁ ছাড়তে রাজি নয়। টাকা হাত বদল হলে সুদ নিয়ে ফিরবে এর মধ্যে তার কাছে আর কোনো জটিল হিসাব নেই।
৩০৬ মানিক রচনাসমগ্রবনমালী কটমট করে তাকিয়েছিল। দু বার মুখ খুলে নরম গরম অনেক কথা বলে ব্যর্থ হয়ে সে গুম খেয়ে গিয়েছিল। কারখানায় অ্যাকসিডেন্ট ঘটে সে তিন হপ্তার ওপর বসে আছে, এখনও হাতে ব্যান্ডেজ বাঁধা। ঘটি বাটি তার বউও বাঁধা দিতে শুরু করেছে, তবে সুখলালের কাছে নয়। সুখলালের প্রতি তার একটা বিজাতীয় ঘৃণা আছে। অন্য কোনো কারণে নয়, সংগতি থাকতেও বউকে সুখলাল বাবুদের বাড়ি খাটতে দেয় বলে। ওটা হল গিয়ে কী জানেন বাবু, —লোচনের হাসি শান্ত, স্বস্তিকর, —ওরকম হয়।
মানুষের জিদ চেপে যায়, সেটাই আসল, পয়সাটা নয়। কিশোরীবাবু কাল আধসের মোটা দানা চিনি নিলেন, দাম সাড়ে আট আনা, একটা আধুলি দিলেন। আমি বললাম, আর দু পয়সা বাবু? কেন, তোমায় সাড়ে আট আনা দিয়েছি। না বাবু একটা আধুলি দিয়েছেন, দু পয়সা দেননি। বাবু চটে উঠলেন, আমি বলছি সাড়ে আট আনা দিয়েছি, নিজে গুণে দিয়েছি, তবু তুমি না বলবে? আমি বললাম, যাক গে বাবু, দুটো পয়সার ব্যাপার তো। শুনে সে কী রাগ কিশোরীবাবুর! চটেমটে বললেন, তার মানে? আমি মিছে কথা বলছি? তোমায় ঠকাচ্ছি দু পয়সা? আমি যত বলি, যাক না বাবু, আমারই ভুল হয়েছে, বাবু তত চটে যান! বললেন, দাঁড়াও, তোমায় আমি হিসেব করে দেখাচ্ছি আমি মিছে কথা কই না। দশ টাকার নোট নিয়ে বেরিয়েছিলাম, খরচ মেলালে বেরিয়ে পড়বে তুমি মিথ্যেবাদী কি আমি মিথ্যেবাদী। চাকরের কাছ থেকে বাজারের থলি নিয়ে ঢাললেন, পকেট থেকে সিগ্রেটের প্যাকেট আর কী সব টুকিটাকি জিনিস বার করলেন, ব্যাগ ঝেড়ে পয়সাকড়ি সামনে রাখলেন। তারপর কাগজ পেনসিল নিয়ে হিসেব মেলাতে লাগলেন। সকালবেলা খদ্দেরের ভিড় কত, কেনাবেচা সব বন্ধবিনোদ মুখ তুলে স্থির দৃষ্টিতে তাকায়, উৎসুক হয়ে এমনভাবে প্রশ্ন করে যেন ভেতরে আরও যে সব গোপনীয় ব্যাপার ধরণীর জানা আছে শুনতে না পেলে তার চলবেই না। —কী ব্যাপার আছে বাবু? রাগে সে কাঁপছে বোঝা যায়। তবে তার ব্যান্ডেজ বাঁধা ডান হাতটাও চোখের সামনেই ছিল। সেদিকে চেয়ে সুখলাল ব্যঙ্গভরে বলে, কী জন্য পাব না? দু আনার জন্য এত কাণ্ড যাদের খাপছাড়া উদ্ভট মনে হবে, বানানো গল্পের মতো মনে হবে, সোজাসুজি তাদের কেউ বলতেও যায় না ব্যাপারটা। ঘটনাচক্রে দু-একজনের কানে যায়। যেমন লোচন সা ব মুদি দোকানে বিনোদ যখন লোচনকে ঘটনার বিবরণ বলে, ধরণীবাবু বিপিনবাবু অবিনাশবাবুও তা শোনে। ধরণীবাবু উকিল, অন্য দুজন চাকুরে। এই জন্য পাবে না। —বাঁ হাতে বনমালী তার গালে একটা চড় বসিয়ে দেয়। —শালা দালাল! সবাই চুপ করে থাকে, সুখলালও। এতক্ষণে তার চৈতন্য হয়েছে। বনমালীকে কেউ সমর্থন জানায় না কিন্তু প্রতিবাদও আসে না কারও কাছ থেকে। বনমালী যা ভালো বুঝেছে করেছে, কারও কিছু বলার নেই। অবিনাশ বলে, ঝগড়া মারামারি তো লেগেই থাকে, একটা উপলক্ষ পেলেই হল। সকালবেলাই মদটদ খেয়ে হয় তো—বনমালী হঠাৎ গর্জন করে ওঠে, এ সুদ তুমি পাবে না সুখলালকিন্তু সুখলাল তার মানে জানে। ধরণী উদাসভাবে বলে, ভেতরে আরও কত ব্যাপার আছে ধরণী ব্যঙ্গ টের পায়।
—সে তোমরাই জানো! ব্যাপার আছে নিশ্চয় নইলে—বিপিন বলে, মেয়েছেলের ব্যাপার হতে পারে। নইলে দু গণ্ডা পয়সার জন্য—ছোটোবকুলপুরের যাত্রী ৩০৭একভাবে বেড়ে কমে বৃষ্টি চলেছে। জোরে বৃষ্টি নামায় দোকানে আটকে না গেলে বিনোদের কথাও ধরণীদের কানে যেত না, দাঁড়িয়ে লোচনের গল্প শোনারও সময় হত না। বৃষ্টি আবার ধরে আসায় যাবার জন্য পা বাড়িয়ে ধরণী বলে, কিশোরীবাবু কিন্তু বললেন, তুমি নাকি খুব মেজাজ দেখিয়েছ, অভদ্র ব্যবহার করেছ। তুমি নাকি ওজনে কম দাও, খুঁজে পেতে সস্তা দরে খারাপ মাল আনো। তা যাই বলো, দোকানটা তোমার বড়ো নোংরা লোচনতারা তিনজন বিদায় হলে লোচন বিনোদকে এবং সাধারণভাবে উপস্থিত খদ্দেরকে উদ্দেশ করে বলে, শুনলে? তাই আজ কিশোরীবাবু লক্ষ্মী ভান্ডার থেকে সওদা নিয়ে গেলেন, আমি ভাবি ব্যাপার কী! নিজে ভুল করলেন, নিজে চটাচটি করলেন, এখন খদ্দের ভাঙাচ্ছেন! দুটা পযসার জন্যএ কিশোরীবাবু? মুখ গোমড়া করে তিন-চারবার হিসাব মেলালেন, টাকা পয়সা গুণলেন। তারপর খানিক গুম খেয়ে থেকে হেসে বললেন, আমার ভুল হয়েছিল লোচন, দু পয়সা বেশি হচ্ছে! এই নাও তোমার দু পয়সা। রইল! —লোচন মুখের স্থায়ী হাসিকে আরও ফলাও করে তোলে, —জিদ চাপলে দু-পয়সার জন্যও অনেক কাণ্ড হয় বাবু। তারপর কী হল লোচন? কিশোরীবাবু কী করলেন? ৩০৮ মানিক রচনাসমগ্রবস্তিতে পাপপুণ্যের, আত্মরক্ষা আব ধ্বংস হওয়ার সীমানা বড়ো সংকীর্ণ। বড়ো অস্থায়ী বস্তির মেয়ের এই পরম লোভনীয় দৈহিক ও মানসিক অবস্থাটি, যৌবনের প্রথম জোযারে থইথই করা দেখতে দেখতে দুদিনে শেষ হয়ে ভাঁটার টানে কঙ্কাল বেরিয়ে পড়ে, এমনই ভয়ানক সেখানে খেয়ে পরে বাঁচার লড়াই। বাবুদের মতো তো নয় যে সামলে সুমলে ডাক্তার দেখিয়ে টনিক খাইয়ে শুইয়ে বসিয়ে হাসি তামাশা খেলাধুলো সিনেমা থিয়েটারে মন ভুলিয়ে বিশ-ত্রিশবছর পর্যন্ত পুষে রাখা চলবে। বস্তির গরিব উপোসি ঘরে রূপ যৌবন স্রেফ প্রকৃতিব খেলা, শুধু একবার দুদিনের জন্য, কুমারী মেয়ের মা হবার জন্য খাঁটি সাজসরঞ্জাম, সেইখানেই খতম। তারপর শুধু কপালের জের টানা। অরাজক লুটের রাজ্যে তাই জগতের সমস্ত লোভ, মালিকবাবুদের লোভ পর্যন্ত, বস্তির মেয়ের দামি দুদিনকে লুট করতে ওত পেতে থাকে। মেয়েটির নাম দুর্গা। নোটন মিস্ত্রির মেয়ে। নোটনেব আর একটি মেয়ে আছে, সেটি খুবই বাচ্চা, নোংরা স্যাঁতসেঁতে দাওয়ায় সবে হামা দিতে শিখেছে। মাঝে মাঝে গড়িয়ে আরও নোংরা ভেজা উঠানে পড়ে গিয়ে তারস্বরে চেঁচায়।
ছেলেমেয়েদের উপর নোটনের ভালোবাসা কত সেটা বস্তির আর দশজনেরটা দিয়েই মাপা চলে, এদিকে আছে ওদিকে নেই, তলানি আছে ফেনা নেই, বস্তির নরম গরম ভোঁতা বাৎসল্য যেমন হয়। বয়সকালে দুর্গা একটু বেশি রকম তড়বড়িয়ে বেড়ে গিয়ে দশটা পুরুষের চোখে বিশেষভাবে আকর্ষণীয় হয়ে ওঠায় বাপের দায়িত্ব সম্পর্কে নোটনের চেতনাও তড়তড় করে বেড়ে যেতে দেখা গিয়েছিল। বাস্তব স্নেহের যা চিরকালের রীতি। ছোটো মেয়েটার দাওয়া থেকে উঠানে গড়িয়ে পড়া নিবারণ করা অসাধ্য না হলেও অতটা আর পেরে ওঠা যায় না, ওটুকু পড়লে মেয়েটার ব্যথা পাওয়ার বেশি ক্ষতির সম্ভাবনা নেই। অনেক চোট জীবনে সইতে হয়েই, এখন থেকেই নয় শিক্ষা শুরু হল, শক্ত হবে। পড়ে গিয়ে মরে যাবাব বা অন্তত হাত পা মাথাটা ভাঙবার ভয় থাকলেও নোটন উদাসীন না থেকে প্রতিবিধানের একটা কিছু ব্যবস্থা নিশ্চয় করত। যেমন বড়ো হলেও দুর্গার সম্পর্কে তারা সচেতন হয়েছে। দুর্গার বুক পিঠ মাজা থেকে সমস্ত শরীরটা অল্পদিনে বর্ষাকালের কলাগাছের মতো পুরন্ত বাড়ন্ত হযে ওঠায মাবাত্মক বিপদেব আশঙ্কা সৃষ্টি হয়ে গেল। বাপ হয়ে তখন মেয়ের দিকে নজর না দিয়ে সাবধান না হযে আর উপায় কী? মেয়েকে আড়াল করে বাঁচিয়ে চলতে কী না করেছে নোটন। দুর্গার মার জ্বর হয়েছিল, তাই মেয়েকে সে একা বাবুদের বাড়ি জল তুলতে বাসন মাজতে পাঠিয়েছিল বলে মেরে সে তার পিঠের চামড়া আস্ত রাখেনি। তাড়াতাড়ি বিনোদের সঙ্গে মেয়ের বিয়ে স্থির করে ফেলেছে। মেয়ের জন্য দুর্গাব মার কোনো ভাবনা নেই এমন নয়, কিন্তু তার মন মেজাজ ভোঁতা হয়ে গেছে। কোনো বিষয়েই তেমন উৎসাহ পায় না। মেয়েটা ভালো থাক সে তো ভালো কথাই। একটু আধটু নষ্ট হলে কী আর কবা যাবে? একেবারে বিগড়ে খারাপ না হয়ে গেলেই হল। এমন করে আগলে রেখে কি স্বর্গ লাভ হবে? মেয়েটাকে বাঁচিয়ে চলার ঝোঁকে, এমন রত্ন তার কুঁড়েঘরে আছে এই গর্বে, কতগুলি দিকে নোটন প্রায় মানুষ হয়ে উঠেছিল। নেশা করে হইচই হল্লার স্বভাব প্রায় ছেড়ে দিয়েছিল, কাজের পর তাড়াতাড়ি ঘরে ফিরতে মনটা ছটফট করত। দুর্গার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হয়ে সে আবিষ্কার করেছে মেয়েটা তার দেখতেই শুধু ভালো নয়, তার স্বভাবটাও বড়ো ভালো। বস্তির অনাবৃত জীবন। বাপ-মা সজাগ সতর্ক থেকে মেয়েকে পাহারা দিতে পারে কিন্তু চারিদিকের লোভকে আড়াল করার সাধ্য কারও নেই। সেটা অন্তর নামক স্থানেই সম্ভব। সেটাই হয়ে
মেয়ে টের পায় চারিদিকে তার জন্য বিপুল কামনা উদ্যত হয়ে আছে, —দুঃখ দুর্দশা লাঞ্ছনা অবজ্ঞা সওয়া মেয়ে! জগতে হঠাৎ নিজের দাম এমন অদ্ভুতরকম চড়ে যেতে দেখে তার মাথা বিগড়ে যায়, সে দিশে হারিয়ে ফেলে। কিন্তু দুর্গা তেমন নয়, সে মাথা ঠিক রেখেছে, তার নিজের মধ্যেই সামলে চলার ঝোঁক আছে। চোখ তুলে সে তার ছোটো জাতটির দিকে তাকায়, অনুভব করে এইবার যে মস্ত একটা বোঝাপড়া করবে বলে চারিদিকে জগৎ উদগ্রীব হয়ে আছে। নিজেরও এই ভাবনায় একটা অদ্ভুত সুখকর অস্থিরতা বোধের মধ্যে তার খেয়াল রাখতে ভালো লাগে না। বোঝাপড়া করলে সেই করবে, সেই বোঝাপড়া করা না করার মালিক। নিজের উপর তার এই মালিকানা স্বত্বকেই তার বাপ সযত্নে রক্ষা করেছে। এরই মধ্যে একদিন কারখানায় মেশিনে জখম হয়ে নোটন তার ঘরের খাটিয়ায় দীর্ঘকালের জন্য বিশ্রাম পায়। ক্ষতিপূরণের প্রশ্ন কোম্পানি আমলেই আনে না, অকাট্য প্রমাণ খুঁজে বার করা হয় যে মাতাল অবস্থায় সম্পূর্ণ নিজের দোষে নোটন বিপদ ঘটিয়েছে, দুর্ঘটনার জন্য অন্য কেউ দায়ী নয়। তবু কোম্পানি দয়া করে প্রাথমিক চিকিৎসা এবং কয়েকটা টাকার ব্যবস্থা করে দেয়। এই নিয়ে একটু গোলমাল হয় কিন্তু ঠিক ওই সময় বিরোধী একটা ইউনিয়ন গড়বার তোড়জোড় চলতে থাকায় সেই ডামাডোলে এটা চাপা পড়ে যায়। ক-মাসে নোটন বিছানা ছেড়ে উঠবে, আবার কাজ পাবে, ঠিক নেই। শুধু দুর্গার মার ঝি-গিবির ভরসা। দু বাড়িতে সে ঠিকে কাজ করছিল, আর এক বাড়িতে কাজ নেয়—দুর্গা সাথে গিয়ে হাত লাগিয়ে কাজ খানিকটা এগিয়ে দিতে আসে। তবু শ্রান্তিতে হাত-পা প্রতিদিন ঝিমিয়ে আসে দুর্গার মার, এমনিতেই তার অবস্থা কাহিল হয়ে আসছে দিন দিন, আঁতুড়ে যাবার সময় ঘনিয়ে এল। আর কিছুদিন পরে কাজ করাই বন্ধ করে দিতে হবে। দু-একটাকা বেতন আগাম নিয়ে চাল আটা এনে কোনোমতে দিন চলে, দু-একদিন উপোস যায়। ঠিকে ঝিরা আজ আছে কাল নেই, বাবুরাও তাই হিসেব করে আগাম বেতন দেয়, কিছু পাওনা হাতে রেখে। নইলে হঠাৎ বিনা নোটিশে কাজ ছেড়ে দিলে বাড়ির মেয়েদের বাসন মাজতে হবে। পাঁচ-ছ তারিখের আগে গতমাসের পুরো বেতন শোধ করে না, বেতন পেয়ে হঠাৎ যদি কাজ ছেড়ে দিয়ে অন্য বাড়ি যায়, বাসন মাজতেই হয় বাড়ির মে
রেশনে পেট ভরে না, শাড়িতে গা ঢাকে না, কোনও একটা শখ মেটে না, খাবার জলটুকুর জন্য নিত্য মারামারি করে প্রাণ যায়, শ্যাওলায় পাঁকে পায়ের হাজা কামড়ায়, আলোহীন বদ্ধ বাতাসে সারা গায়ের ঘামাচি চুলকানি হয়ে দাঁড়ায় তবু বস্তির মেয়েটাব কাছে জীবন মিষ্টি মজাদার লাগে। বাপ কারখানায় খেটে আর মা বাবুদের বাড়ি বাসন মেজে দুটো পযসা ভিক্ষা পায়, তাতেইদুর্গা প্রাণপণে খাটে, বাপের যত্ন করে। সুখলালের উগ্র দৃষ্টি আর নোট দেখানো ইঙ্গিত নিঃশব্দ নিষ্ক্রিয় উপেক্ষায় চেয়ে দেখে, বুড়ি মাতঙ্গিনীর মারফত কে তাকে রাজরানির মতো সুখে রাখতে পাগল হয়েছে তার কাহিনী শুনে নাক সিঁটকোয়, অন্যদের ভাব জমানোর আলগা চেষ্টায় মুচকে হাসে, সরে সরে যায়। প্রথম বাড়িতে কাজ শুরু করেই দুর্গার মা তীব্র আক্রোশে চাপা গলায় ধমকাতে থাকে: হাত চালা হাত চালা, হারামজাদি! খেয়ে খেয়ে হাতি হয়েছিস, হাত চলে না তোর? বলে, খুচখুচ দুটো বাসন মেজে এক বালতি জল তুলে ঘর যাবার মন—বাপকে রেঁধে খাওয়াবেন। দুর্গা আরও জোরে হাত চালিয়ে ঝোঁঝে বলে, আদ্দেকের বেশি কাজ করে দিই তোর ফের বলছিস! তার চোখে জল আসে! এক মুহূর্তের জন্য। ৩১০ মানিক রচনাসমগ্রটুকিটাকি যে জিনিসগুলি বিনোদ তাকে গোপন উপহার দিয়েছে সেগুলি দুর্গা চুপিচুপি ঘাঁটাঘাঁটি করে। উনানে আগুন দিতে হয়নি সেদিন, ভাত রাঁধবার পাট নেই, শূন্য হাঁড়িতে শুধু জল ফুটলে কি ভাত হয়? কী ছাই জিনিসগুলি চিবুনি, খোঁপার নকল ফুল, রঙিন কাঁচের চুমকি বসানো চুড়ি, পুঁতির মালা—এ সব দিয়ে কি পেট ভরবে মানুষের, পেটের আগুন মনের আগুন নেভে? মা ঘরের কোণে মেয়েটাকে কোলে নিয়ে পা ছড়িয়ে বসে কোঁকাচ্ছে। নোটন থেকে থেকে গাল আর শাপ দিচ্ছে মা মেয়ে দুজনকেই—জোয়ান মাগিরা এতকাল তার ঘাড়ে খেয়ে হাতির মতো মুটিয়েছে, দুদিন দুমুঠো ভাতের ব্যবস্থা করতে পাবে না। বড়ো মোড়ের দোকানটায় বেডিয়ো বাজছে শোনা যায়। এদিকে কানের কাছাকাছি কে যেন তীক্ষ্ণসুরে প্রাণপণে বাঁশি বাজিয়ে চলেছে। কীসের শেষ কথা বিনোদ জানে। ক-দিন আগেও দুর্গার সঙ্গে তার ঝগড়া হয়ে গেছে। সে নিঃশব্দে দুর্গার বিস্ফারিত মুখের দিকে চেয়ে থাকে। তার শুকনো শীর্ণ মুখ আর আলুথালু বেশ দেখতে দেখতে নিজেকে বিনোদের বড়ো দুর্বল, অসহায় মনে হয়। তারা দুজনেই জানে এটা কাজের কথা নয়, মিত্রদের বাড়ি দুর্গার মাকে রাখবে না, মিত্রবাবুর দরকার দুর্গাকে।
নোটন একদিন দুর্গাকে একা কাজে পাঠানোর অপরাধে দুর্গার মার পিঠের চামড়া তুলে দিয়েছিল, আজ সে দুর্গাকে একা ওই মিত্রদের বাড়িই কাজ নিতে তাগিদ দিচ্ছে। পঙ্গু অসহায় অবস্থায় বিছানায় পড়ে থেকে উপোস দিয়ে সেরে উঠে কাজে যাবার আশা সফল হবার অনেকজীবনটা তিতো লাগতে শুরু করে দিয়েছে, কারণ দিগন্তে দেখা দিয়েছে আতঙ্কের কালো মেঘ। নোটন পঙ্গু হয়ে পড়েছে বলে শুধু নয়, আজ বাদে কাল তার মা আঁতুড়ে ঢুকবে বলেও নয়। বস্তি বাড়ির মজুরের মেয়ে কি আর বাবুদের বাড়ির মেয়ের মতো বাপ ভাই একমাত্র ভরসা করে থাকে? বড়ো হয়েও যে ওদের কিছু হলেই সর্বনাশ ঘটে যাবে, কূলকিনারা পাবে না। যা হত শুধু দুর্ভাবনার বিষয় তাই আতঙ্কে দাঁড়িয়ে গেছে বিনোদের কারখানায় ছাঁটাই আর ধর্মঘটের জন্য! কী কপাল দুর্গার! ঠিক এই সময়টাতেই বিনোদের কারখানায় হাঙ্গামা শুরু হল, দুদিন সবুর সইল না। ঠিকমিত্তির বাড়ি? মা ও বাড়ি নেক, আমি মার একটা বাড়ি ধরব। এক বাড়ি নে। মিছি বাবুর বাড়িতে নে, ওদের কাজ হালকা। বিনোদও খাটিয়ায় শুয়ে অল্প অল্প কোঁকাচ্ছিল, কারখানার দরজায় পিকেটিং করতে গিয়ে মার খেয়েছে। রাগে ক্ষোভে উত্তেজনায় দুর্গা তখন কাঁপছে, কারও কোঁকানি শোনার মতো অবস্থা তার ছিল না। মা কী বলেছিল দুর্গা শোনেনি, তার বাপ মা তুলে গাল দিতে নোটন আধ-শোয়া অবস্থায় হাতের কাছে আর কিছু না পেয়ে মাটির ভাঁড়টা ছুঁড়ে মারে। ভাঁড়ট� ছিল দইয়ের, দুর্গার মা-ই তার এক মনিব বাড়ি থেকে কুড়িয়ে এনেছিল। ভাঁড়টা নোটনের কফ থুতু ফেলার কাজে লাগছিল। নোটন আশান্বিত হয়ে বলে, যাক না যাক। যেতে দাও। বিনোদ একলা মানুষ, সে এই হাঙ্গামায় জড়িয়ে না পড়লে তার ভাবনা কী ছিল। দুর্গার মা বলে, এত রাতে যাচ্ছিস কোথা শুনি? মা তিন বাড়ি সারতে পারে একা? যাচ্ছি চুলোয়কচি মেয়েটার মাথা কেটে রক্তপাত করিয়ে ভাঁড়টা মেখেতে পড়ে চুরমার হয়ে যায়। আগে অনাহারে মৃত্যুকে এগিয়ে আসতে দেখে আর কোনো হিসাব কি মানুষের থাকে? যখনটা সে শেষ ধাপে পৌঁছেছে, এদিক বা ওদিক তাকে ঝাঁপ দিতেই হবে। নোটনের মুখ দাড়িগোঁফে ভরে গেছে, চোখ কোটরে ঢোকানো। জ্বলজ্বলে চোখে চেয়ে ঝিম ধরা সুরে বলে, এক বাড়িতে এক মাইনেতে দুজনার খাটার দরকার? তুই দু বাড়ি কাজ নে দুর্গা। ছোটোবকুলপুরের যাত্রী ৩১১য়েছে। রাগে ক্ষোভে উত্তেজনায় দুর্গা তখন কাঁপছে, কারও কোকান শোনার মতো অবস্থা তার ছিল না। শুনছ? আজ শেষ কথা বলো। এই দণ্ডে বলো। আজ তবে বরং থাক।
কাল এসে ফের বিবেচনা করা যাবে। তবে যাও সুখলালের ঠেয়ে, আপস করে এসো গে। টাকা নিয়ে খাবার কিনে আনো। আমি সারাদিন খাইনি, ভাইবোন খায়নি। আজ কী খাবি তোরা? কী বল অ্যাঁ? চলে যাবে! মা জোগাড়ে গেছে। তোকে চাই দুর্গা। তুমি ধর্মঘট চাও, না মোকে চাও? বিনোদের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে আস্তে আস্তে পা ফেলে দুর্গা সুখলালের আস্তানার দিকে এগোয়। যে সুখলাল কালও তাকে বড়ো বড়ো চোখে দেখেছে, নোট দেখিয়েছে। বাঁচতে হলে লড়াই না করে উপায় কী? বিনোদ চুপচাপ কিছুক্ষণ ভাবে। তখন সেইখানে দাঁড়িয়ে দুর্গা আবার মনে মনে হিসাব করে। উলটে-পালটে বিবেচনা করে আগাগোড়া সমস্ত ব্যাপারটা। ঘাড়টা তার একটু কাত হয়ে আসে ভাবনার দাপটে। ভাবতে ভাবতে তার মনে হয়, কী আর এমন লাভ হবে এই লোকটাকে আর তার লড়াইটাকে ভেঙে দিয়ে? কোন স্বার্থটা বজায় থাকবে তার? তার চেয়ে কোনোরকমে সেই যদি চালিয়ে নিতে পারে কিছুদিন সেও রইল তার এই মানুষটাও রইল, তাদের ভবিষ্যৎটাও রইল। হয়নি কিছু। শেষ কথা বলে দাও, আমি আমার পথ দেখি। আবার কী হল? বিনোদ বলে, আচ্ছা তুই বাড়ি যা দুর্গা, খাবার নিয়ে যাচ্ছি। তোমার কী হয়েছে শুনি? বিনোদ তীব্র গলায় বেঁঝে ওঠে, কী হবে, পিটুনি দিয়েছে। যা তুই বাড়ি যা। দুর্গী জোরে জোরে নিশ্বাস ফেলেন। এবার এতক্ষণে মানুষটা তার চোখে পড়েছে। খানিক চুপচাপ দাঁড়িয়ে থেকে দুর্গা নরম গলায় শুধোয়, তুমি একা আপস করলে কী হবে? বিনোদ কথা কয় না। ঘরের কোনার দিকে কটমট করে তাকিয়ে থাকে।
